দেশের স্বর্ণবাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ ক্রেতা, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, দিন দিন স্বর্ণ কেনার সক্ষমতা হারাচ্ছে। বাজারে চাহিদা থাকলেও উচ্চমূল্য এবং কর-ভ্যাটের চাপের কারণে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী- উভয় পক্ষই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে এবং স্বর্ণকে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখতে নতুন কর কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
সংগঠনটির মতে, বর্তমানে স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই বহন করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে স্বর্ণের দাম আরও বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছর থেকে শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি স্বর্ণে নির্দিষ্ট ২ হাজার টাকা ভ্যাট নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাজুস।
গত কয়েক বছরে দেশের স্বর্ণবাজারে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। একসময় যে স্বর্ণ মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ও অলঙ্কারের প্রধান মাধ্যম ছিল, এখন তা অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। চলতি বছর বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম দ্রুত বেড়েছে, যা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামের ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে ক্রেতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা ব্যবসায়।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্বর্ণ আমদানির সময় বিভিন্ন ধাপে কর ও ভ্যাট দিতে হয়। পরে সেই স্বর্ণ দিয়ে তৈরি অলঙ্কার বিক্রির সময় আবারও ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। এতে ব্যবসায়ীদের লাভ না বাড়লেও চূড়ান্ত পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
বাজুসের নেতারা মনে করেন, এই দ্বৈত কর কাঠামো দেশের বাজারকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে অনেক ক্রেতা বিদেশ থেকে স্বর্ণালঙ্কার কেনার দিকে ঝুঁকছেন।
আরও পড়ুন
শুধু স্থানীয় বাজার নয়, আন্তর্জাতিক স্বর্ণালঙ্কার বাজারেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে বর্তমান আমদানি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা রফতানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজুস বলছে, স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনুমোদন, উচ্চ ব্যয় এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এসব জটিলতা কমানো গেলে বাংলাদেশও বৈশ্বিক স্বর্ণালঙ্কার বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারের আকার ক্রমেই বড় হচ্ছে এবং এর একটি বড় অংশ জুয়েলারি শিল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধির এই প্রবণতা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই খাতকে আরও পরিকল্পিতভাবে বিকশিত করার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণ খাতকে রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসেবে দেখার পাশাপাশি রফতানি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। এজন্য আমদানি নীতি সহজ করা, কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, ভ্যাট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হলে একদিকে যেমন ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও বাজারে নতুন গতি ফেরাতে সক্ষম হবেন।
এএডি/