ইউক্রেন সীমান্ত পেরিয়ে রোমানিয়ার অভ্যন্তরে একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রাশিয়ার সামরিক ড্রোন আছড়ে পড়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দুজন রোমানীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের (ন্যাটো) পূর্ব সীমান্তে সংঘটিত এই নজিরবিহীন ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বুখারেস্ট। এই ঘটনার জেরে কৃষ্ণসাগর বন্দর নগরী কনস্টান্টায় নিযুক্ত রাশিয়ার কনসাল জেনারেলকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বহিষ্কার এবং সে দেশের কনস্যুলেট অফিসটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে রোমানিয়া সরকার।
রোমানীয় প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত শুক্রবার গভীর রাতে ইউক্রেন লক্ষ্য করে চালানো রাশিয়ার এক ঝাঁক ড্রোন হামলার একটি অংশ রোমানিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশ করে। দেশটির রাডারে ড্রোনটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই রোমানিয়ার গালাতি শহরের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে সেটি আছড়ে পড়ে এবং ভবনে আগুন ধরে যায়।
আকস্মিক এই অনুপ্রবেশের পর রোমানিয়ার বিমান বাহিনীর দুটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং একটি সামরিক হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় দুজন সামান্য আহত হয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের এই বিপজ্জনক ছিটকে পড়া (স্পিল-ওভার) ন্যাটোর পূর্ব প্রান্তে সরাসরি রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই ঘটনার পরপরই রোমানিয়ার স্বাধীন প্রেসিডেন্ট নিকুসর দান দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন। বৈঠক শেষে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর যে আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তার আঁচ আমাদের নাগরিকদের ওপর এসে পড়বে— এটি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি অবিলম্বে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনুপাতিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন, যার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কনস্টান্টার রুশ কনসালকে বহিষ্কার করা হলো।
একই সাথে রোমানিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী ইলি বোলোজান জানিয়েছেন, দেশের আকাশসীমা সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সেফ’ প্রকল্পের আওতায় আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি অত্যাধুনিক ড্রোন-রোধী প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে যাচ্ছে বুখারেস্ট। এছাড়া রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার সকালে বুখারেস্টে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করেছে।
এই ঘটনায় ইউরোপজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেছেন, রাশিয়ার এই আগ্রাসী যুদ্ধ এবার আরেকটি বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করল। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লো সিকোরস্কি রয়টার্সকে বলেন, এটি ইচ্ছাকৃত হোক কিংবা রাশিয়ার অদক্ষতার কারণে হোক— রাশিয়া যে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তা আবারও প্রমাণিত হলো। ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুত্তে এবং ন্যাটোর মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকারও এই ‘বেপরোয়া অনুপ্রবেশের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ন্যাটো তার অঞ্চলের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে কাজাখস্তানের আস্তানা থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, রোমানিয়া বলছে এটা রাশিয়ান ড্রোন? কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও পরীক্ষা ছাড়া এই ড্রোনের উৎস নিশ্চিত করা অসম্ভব। এর আগে ফিনল্যান্ড বা পোল্যান্ডে পড়া ড্রোনগুলোও পরে ইউক্রেনের বলে প্রমাণিত হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। মস্কো এই ঘটনার যৌথ তদন্তের জন্য ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের তথ্য রোমানিয়ার কাছে দাবি করেছে।
অন্যদিকে, রুশ নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ম্যাক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ইউরোপীয় দেশগুলোকে উল্টো হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। যতদিন তারা ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যাবে, এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই এই বিষয়ে ইউরোপের মুখ বন্ধ রাখা উচিত।