দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো- যেসব রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা কার্যকর হয় না, তাদের জন্য নতুন সমাধান খুঁজে বের করা। এবার সেই কঠিন বাস্তবতায় আশার আলো দেখাচ্ছে একটি নতুন প্রজন্মের ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশন, যা উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘অ্যামিভান্টাম্যাব’ নামের একটি বিশেষ ইনজেকশন এমন রোগীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর ফল দিয়েছে, যাদের ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিল না। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশ্বের ১১টি দেশে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেন এমন রোগীরা, যাদের ক্যানসার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা চিকিৎসার পর আবার ফিরে এসেছিল। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে যায়। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, কয়েকজন রোগীর শরীরে টিউমারের কোনো অস্তিত্বই আর শনাক্ত করা যায়নি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীর ওপর এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের ক্ষেত্রে টিউমার সংকুচিত হয় অথবা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মধ্যে ১৫ জন রোগীর শরীরে টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হওয়ার তথ্য গবেষকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিকিৎসার অন্যতম শক্তি হলো এর বহুমাত্রিক কার্যপ্রক্রিয়া। এটি ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী নির্দিষ্ট প্রোটিনকে বাধাগ্রস্ত করে, চিকিৎসা প্রতিরোধের কৌশল ব্যবহার করা ক্যানসার কোষের সক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং একই সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের গবেষক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেছেন, যেসব রোগীর চিকিৎসার বিকল্প প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যেও এই ওষুধের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার মতে, ভবিষ্যতে হাজার হাজার রোগী এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হতে পারেন।
গবেষণার ফলাফল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন, এই চিকিৎসা ক্যানসার মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
চিকিৎসাটির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি শিরায় দীর্ঘ সময় ধরে ড্রিপের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হয় না। বরং ত্বকের নিচে একটি ছোট ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া যায়। ফলে রোগীদের হাসপাতালভিত্তিক দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার ঝামেলা কমে যায় এবং চিকিৎসা গ্রহণ আরও সহজ হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। তাদের অনেকে জানিয়েছেন, চিকিৎসা শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যথা, ফোলাভাব এবং খাওয়াদাওয়ার সমস্যার উন্নতি দেখা গেছে। অনেকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষণাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এতে এমন এক ধরনের মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের রোগ সাধারণত তুলনামূলক কঠিন এবং চিকিৎসার সাফল্যের হারও কম। সেই রোগী গোষ্ঠীর মধ্যেও ইতিবাচক ফল পাওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এএডি/