মোবাইল হাতে নিয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতেই চোখ আটকে গেল একটি সংবাদে ‘আদালতের রায়ে নিতুর ধর্ষকের ফাঁসি কার্যকর।’ বুকের ভেতর যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তি চলে এলো। মনে হচ্ছে বহুদিন পর এ দেশের বাতাস পাপমুক্ত হয়ে যেন হালকা হয়ে গেল।
ছোট্ট শিশু নিতু, যে জীবনের মানে বুঝে ওঠার আগেই এক নরপিশাচের বিকৃত পাশবিকতার শিকার হয়েছিল, অবশেষে আজ তার আত্মা হয়তো একটু শান্তি পেল। চারপাশটায় যেন এক স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে।
মা তার সন্তানকে নিশ্চিন্তে স্কুলে পাঠাচ্ছে, শিশুরা আবারও মাঠে ছুটছে, নারীরা আর আতঙ্কের চোখে দেখছে না তার সন্ধ্যার পথকে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ যেন শিশুসুলভ, নারীবান্ধব ও নিরাপদ একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।
হঠাৎ ভোরের অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বুঝতে পারলাম এতক্ষণ যে কাল্পনিক বাংলাদেশের চিত্র দেখছিলাম, তা নিছক একটি দুঃস্বপ্নমাত্র। বাস্তবের বাংলাদেশ এখনও বিভীষিকাময়, আতঙ্কগ্রস্ত ও রক্তাক্ত।
বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ষণ ভয়ংকর এক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রতি স্ক্রলেই ভেসে আসছে বীভৎসতা ও নির্মমতার খবর। ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধা এমনকি যেকোনো বয়স কিংবা যেকোনো লিঙ্গের কেউই যেন বাদ পড়ছে না এই হিংস্র হায়েনাদের ভয়ংকর থাবা থেকে।
সম্প্রতি মাত্র ৮ বছর বয়সের শিশু রামিসার পৈশাচিক ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে আবারও বাকরুদ্ধ করেছে। এক জোড়া নিষ্পাপ চোখে এই পৃথিবীর দেখানোর কথা ছিল রঙিন ফুলের মতো কোমলতা, অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা আর বিকালের খেলাধুলা। কিন্তু এই বিভীষিকাময় পৃথিবী তাকে দেখিয়েছে মানুষের মুখোশে লুকিয়ে থাকা এক হায়েনার ভয়ংকর রূপ। আচড়ানো পরিপাটি মাথার চুলগুলোতে রক্তিম লাল জবার বিপরীতে পেয়েছে এলোমেলো চুলে লাল রক্তের ছোপ।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ওই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকায় এখন আর মানুষকে তেমন বিস্মিত করে না। সমাজবিজ্ঞানে বলা আছে, কোনো অন্যায় যদি বারবার ঘটতে থাকে, তা হলে একসময় মানুষ সেটা সহ্য করতে থাকে এবং বিষয়টি স্বাভাবিক লাগা শুরু করে। এভাবেই সমাজটা যেন আজ এক নিষ্ঠুর সমাজে পরিণত হচ্ছে। যেখানে ধর্ষণের সংবাদ প্রকাশের পর কয়েক ঘণ্টা ফেসবুকে আলোচনা, সমালোচনার ঝড় ওঠে। তারপর আবার সেটি চাপা পড়ে যায় নতুন কোনো ঘটনায়।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এই অপরাধগুলো ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে কেন? ক্রিমিউনোলজিতে এর ব্যাখ্যা হচ্ছে মানুষ অপরাধ কম করে তখনই যখন দেখে ন্যায় বিচারের মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে। কিন্তু এ দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীর মনে একটা বিশ্বাস তৈরি করেছে যে ‘শেষ অব্দি কিছুই হবে না’।
দুর্বল বিচার ব্যবস্থার, পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, আইনের দীর্ঘসূত্রতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি, তদন্তে গাফিলতি, মেডিকেল রিপোর্টে বিলম্বের মতো ঘটনাগুলো অপরাধীদের জন্য অদৃশ্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে একটি শিশু বা নারীর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও শুধু কাগজের একটি দুর্বল নথিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ফলে বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণ ও খুনের মতো ভয়ংকর অপরাধগুলো।
আরও ভাবনার বিষয় হচ্ছে, আমাদের সমাজব্যবস্থায় ভুক্তভোগীকে প্রশ্নবিদ্ধ ও দোষারোপ করার মতো ভয়ংকর এক রোগ বাসা বেঁধেছে। ধর্ষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা ও জীবন-দর্শনসহ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার শুরু হয়। সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় আদর্শকে ধারণ না করা, নৈতিকতার অভাব, পর্নগ্রাফিতে আসক্তির ফলে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি লোপের মাধ্যমে এরূপ বিকৃত মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছে।
এমন অবস্থার পরবর্তনের জন্য সরকারকে বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও দ্রুততম করতে হবে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও বেশি চৌকশ ও দক্ষ করে তুলতে হবে। ধর্ষণ মামলা পরিচালনা করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা এখন সময়ের দাবি। মামলার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিচারকার্য পরিচালনা করতে হবে।
একই সঙ্গে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একটি সভ্য সমাজের অংশ হিসেবে ধর্ষণের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস চলবে না । পরিবার থেকেই শিশুদেরকে নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা ও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে হবে। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিশুরা পরম স্নেহে ফুলের মতো নিরাপদে বড় হবে। নারীকে তার নিরাপত্তার স্বার্থে পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। আর কার্যকর বিচারব্যবস্থার উপস্থিতিতে কেউ অপরাধ করার চিন্তাটুকুও করতে পারবে না।
এভাবেই হয়তো এক দিন সত্যিই আমার স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ নেবে। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই দেখব ‘বাংলাদেশে ধর্ষণের হার শূন্যের কোটায়।’
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর
/এসএকে