দীর্ঘ ২০ বছর পরও গেরো খুলল না। ট্রফি ছোঁয়া হলো না ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনালের। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আবারও হেরে গেল গানাররা। শনিবার রাতে বুদাপেস্টে শিরোপা লড়াইয়ে টাইব্রেকারে আর্সেনালকে ৪-৩ (১-১) গোলে হারিয়ে ট্রফি জয়ের উৎসবে মাতে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয় ক্লাবটির।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে ট্রফি না জিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার অনাকাক্সিক্ষত রেকর্ডের মালিক আর্সেনাল। ২২৬ ম্যাচ। রেকর্ড ভাঙার সুবর্ণ সুযোগ ছিল মিকেল আর্তেতার দলের। পিএসজিকে হারিয়ে সেই কাজটা শিষ্যরা করে দেখাতে ব্যর্থ। তাই তো ম্যাচ শেষে আর্তেতার কণ্ঠে হতাশার সুর। যেখানে বেজেছে কষ্টের রাগিনীও। আর্তেতা জানিয়েছেন, ‘পুরো টুর্নামেন্টে এতটা ধারাবাহিক থাকার পর ফাইনালে এসে টাইব্রেকারে শিরোপা হারানো মেনে নেওয়া খুব কঠিন।’
২০০৬ সালে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে খেলে আর্সেনাল। সেবার স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনার কাছে হেরে শিরোপার স্বপ্নভঙ্গ হয় গানারদের। অথচ শুরুতে গোল করে এগিয়ে ছিল আর্সেনালই। শেষে বার্সার কাছে ২ গোল হজম করে উল্টো ম্যাচটি ২-১ গোলে পরাজিত। সেই স্মৃতিই যেন শনিবার রাতে বুদাপেস্টে ফিরে এলো। এবারও শুরুতে গোল আর্সেনালের। পিএসজি শিবিরে থমথমে পরিবেশ। অথচ ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে চ্যাম্পিয়ন পিএসজি।
১৯৫৫-৫৬ সালে ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পথচলা। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও মাত্র তিনবারই তাতে ফাইনাল খেলেছে পিএসজি। তাও একবিংশ শতাব্দীতে। গত শতাব্দীতে দলটি সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি।
পিএসজির উত্থান ২০২০ করোনাকালে। ওই বছর প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে। তবে শিরোপা নিয়ে ঘরে ফেরা হয়নি। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালে। সেবার ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপ সেরার খেতাব জেতে ফরাসিরা। আর এবার আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপার স্বাদ নিল।
রিয়াল মাদ্রিদ এবং আয়াক্সের পর পিএসজি তৃতীয় দল, যারা টানা দুই মৌসুমে নিজেদের ঘরোয়া লিগ শিরোপার পাশাপাশি ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জিতল। অথচ আর্সেনালের বিপক্ষে শনিবার রাতের শুরুর গল্পটা কিন্তু এমন ছিল না। কাই হাভার্টজের গোলে শুরুর লিড আর্সেনালের।
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে দারুণ এক জোরালো শটে পিএসজির জাল কাঁপান হাভার্টজ। এই গোলে ব্যক্তিগত রেকর্ডেও নাম তোলেন। তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে গোলের কীর্তি হাভার্টজের (চেলসি, আর্সেনাল)। এর আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর জুভেন্টাস ও বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই কীর্তি গড়েছেন মারিও মানজুকিচ।
গত বছর সেমিফাইনালে এই পিএসজির কাছে হেরেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বিদায় নিয়েছিল আর্সেনাল। এবার ছিল দলটির প্রতিশোধের মিশন। মিকেল আর্তেতা বাহিনী সেটা করে দেখাতে ব্যর্থ। টাইব্রেকার নামক ভাগ্য পরীক্ষায় পিএসজির কাছে ডাহা ফেল।
বুদাপেস্টের ফাইনালে শনিবার রাতে ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। প্রথমার্ধে হাভার্টজের গোলে এগিয়ে যায় আর্সেনাল, দ্বিতীয়ার্ধে উসমান দেম্বেলের গোলে সমতায় ফেরে পিএসজির। নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় থাকলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ২০১৬ সালের পর এই প্রথম অতিরিক্ত সময়ে গেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল।
অতিরিক্ত সময়েও আসেনি ফল। ৩০ মিনিট দুদল গোল আদায়ের চেষ্টা করেও ছিল ব্যর্থ। এরপর ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় টাইব্রেকারে। যেখানে প্রথম শট নেন পিএসজির গনসালো রামোস। গোল ১-০। আর্সেনালের প্রথম শট নেন ভিক্টর গিয়োকেরেস। গোল ১-১। পিএসজির দ্বিতীয় শট নেন দেজিরে দুয়ে। গোল ২-১। আর্সেনালের দ্বিতীয় শট নেন এবেরেচি এজে। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে শট নিতে গিয়ে বাম পাশ দিয়ে বাইরে মেরে দেন। পিছিয়ে পড়ে আর্সেনাল ২-১-এ।
এরপর পিএসজির তৃতীয় শট নেন নুনো মেন্দেজ। গোলরক্ষক ডেভিড রায়া ডান পাশে ঝাঁপিয়ে বলটি ফিরিয়ে দেন। গোল হয়নি, ২-১। আর্সেনালের তৃতীয় শট নেন ডেকলান রাইস। গোল ২-২। পিএসজির চতুর্থ শট নেন আশরাফ হাকিমি। গোল ৩-২। আর্সেনালের চতুর্থ শট নেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। গোল ৩-৩। পিএসজির পঞ্চম শট নেন বেরালডো। গোল ৪-৩। আর্সেনালের পঞ্চম শট নেন গ্যাব্রিয়েল ম্যাগেলহেস। কিন্তু বলটি তিনি মেরে দেন পোস্টের অনেক ওপরে। ফলে ৪-৩ গোলে জয়ী পিএসজি।
কয়েক দিন আগে লিগ শিরোপা জিতে দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষা অবসান ঘোচায় আর্সেনাল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও এমন রেকর্ড গড়ার সুযোগ ছিল। শিরোপা খরা কাটিয়ে ২০ বছরের অচলায়তন ভাঙারও। তবে পিএসজির দুর্দান্ত নৈপুণ্য শেষ হাসি হাসতে দেয়নি গানারদের।
/এসএকে