অর্থনীতির ধীরগতির মধ্যে নির্মাণ খাত যখন চাহিদা সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপে রয়েছে, তখন রড ও সংশ্লিষ্ট স্টিল পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর পরিকল্পনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে। আগামী জাতীয় বাজেটে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাইল্ড স্টিল (এমএস) রড ও অন্যান্য স্টিলজাত পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত সুনির্দিষ্ট কর বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতি টনে করের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব সরাসরি নির্মাণ ব্যয়, আবাসন খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমে পড়তে পারে। কারণ দেশের নির্মাণ শিল্পে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপকরণগুলোর একটি হলো এমএস রড।
সূত্রগুলো বলছে, রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত স্টিল পণ্যের ওপর বর্তমানে যে সুনির্দিষ্ট কর রয়েছে, সেটি বাড়ানোর চিন্তা চলছে। একইভাবে বিলেট, ইনগট এবং এসব কাঁচামাল থেকে তৈরি বিভিন্ন স্টিল পণ্যের করহারও পুনর্নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন
রাজস্ব প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বর্তমান কর কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের যুক্তি, প্রস্তাবিত বৃদ্ধি অনুযায়ী প্রতি টনে করের পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও সরকারের রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে শিল্প উদ্যোক্তারা ভিন্ন মত পোষণ করছেন। তাদের দাবি, বর্তমানে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অবকাঠামো প্রকল্পের গতি কমে যাওয়া, আবাসন খাতে বিনিয়োগ সংকোচন এবং ঋণের উচ্চ সুদের কারণে স্টিল শিল্প কঠিন সময় পার করছে।
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে বাজার ধরে রাখতে উৎপাদন খরচের কাছাকাছি বা তারও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে নতুন কর আরোপ বা কর বৃদ্ধি হলে উৎপাদকদের মুনাফা আরও সংকুচিত হবে এবং বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রডের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও দেখা যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যে রড তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হতো, বর্তমানে তার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন টন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শিল্প খাতের পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কারণ স্টিল শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত আবাসন, অবকাঠামো এবং সাধারণ নির্মাণ ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এএডি/