দেশের সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা খাতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি) এখন মূল বাধা বা ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বাধ্যতামূলক পুনঃবীমার টাকা সময়মতো না পাওয়ায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের দাবি মেটাতে পারছে না। ফলে পুরো খাতে এক নীরব ও গভীর সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে, যার জেরে তৈরি হয়েছে তীব্র আস্থার সংকট এবং একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বীমা করা বন্ধ করে দিয়েছে।
বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে মোট ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বীমা দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে পরিশোধ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা (২৫ শতাংশ)। বিপরীতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থাৎ ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকার (৭৫ শতাংশ) দাবিই বকেয়া পড়ে রয়েছে। আর এই বিশাল বকেয়ার জন্য সিংহভাগ দায়ী সাধারণ বীমা করপোরেশন।
মূল সংকট পুনঃবীমায় : হাত-পা বাঁধা বেসরকারি খাতের : খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের এই বিপুল পরিমাণ দাবি বকেয়া পড়ার পেছনে মূল কারণ সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে কোম্পানিগুলোর ঠিকমতো পুনঃবীমার টাকা না পাওয়া।
বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের (বিজিআইসি) মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাইফুদ্দীন সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো যে ব্যবসা (প্রিমিয়াম আয়) করে তার ৮০ শতাংশের ওপরে পুনঃবীমা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই পুনঃবীমার ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনে করতে হয় এবং বাকি ৫০ শতাংশ বিদেশে করার সুযোগ আছে। বাইরের অংশ থেকে পুনঃবীমার টাকা ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ বীমা করপোরেশনে করা বাধ্যতামূলক ৫০ শতাংশের টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বকেয়ার সিংহভাগই এককভাবে সাধারণ বীমার কাঁধে : তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুরো খাতের বকেয়া দাবির সবচেয়ে বড় অংশ আটকে আছে স্বয়ং সাধারণ বীমা করপোরেশনেই। প্রতিষ্ঠানটিতে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বীমা দাবি উত্থাপিত হলেও তারা পরিশোধ করেছে মাত্র ২৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা ১২.০৬ শতাংশ। অর্থাৎ এককভাবে এই একটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই বকেয়া রয়েছে ২ হাজার ১৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
সাধারণ বীমার এই ধীরগতির প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের বড় বড় কোম্পানির ওপরও। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকা দাবির বিপরীতে বকেয়া ৩২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা (৮০.১৮ শতাংশ)। রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে বকেয়া ১৪০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার মধ্যে বকেয়া ১৩০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
চার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা অস্তিত্ব সংকটে : সাধারণ বীমার টাকা ছাড় না হওয়ায় চার প্রতিষ্ঠানের দাবি পরিশোধের হার আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এই কোম্পানিগুলো বকেয়া ৯০ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে রয়েছে- পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের ২৭.৬৯ কোটি টাকা দাবির মধ্যে বকেয়া ২৬.৫৭ কোটি টাকা (৯৫.৯৫ শতাংশ)। পিপলস ইন্স্যুরেন্স ৯৪.১৫ কোটি টাকার মধ্যে বকেয়া ৮৮.০৬ কোটি টাকা (৯৩.৫৩ শতাংশ)। নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ৭৪.১৯ কোটি টাকার মধ্যে বকেয়া ৬৯.২৩ কোটি টাকা (৯৩.৩১ শতাংশ)। বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ৭.১০ কোটি টাকার মধ্যে বকেয়া ৬.৫৪ কোটি টাকা (৯২.০৬ শতাংশ)।
এ ছাড়াও রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ এবং দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মতো আরও ৭টি কোম্পানির দাবি পরিশোধের হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।
ব্যতিক্রমী চিত্রে কিছু ভালো কোম্পানি : বীমা খাতের এই সামগ্রিক সংকটের মধ্যেও কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করে সততার পরিচয় দিচ্ছে। এর মধ্যে- ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা (৯৮.৯৪ শতাংশ) পরিশোধ করেছে। জনতা ইন্স্যুরেন্স ২২ কোটি ২১ লাখ টাকার মধ্যে ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা (৯৫.২০ শতাংশ) পরিশোধ করেছে। ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স ৯৩.৫১ শতাংশ দাবি পরিশোধ করেছে। সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ৯০.৫১ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি করেছে।
এ ছাড়াও ইউনিয়ন, ফেডারেল, প্রাইম ইসলামী, নিটল, সিকদার ও রূপালী ইন্স্যুরেন্সের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো। তবে ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া, সেনা কল্যাণ বা প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রায় ডজনখানেক কোম্পানির দাবি পরিশোধের হার ৫০ শতাংশের নিচে রয়েছে।
আস্থার সংকট ও বহুজাতিক কোম্পানির মুখ ফিরিয়ে নেওয়া : একটি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, সার্বিকভাবে দাবি পরিশোধের হার ২৫ শতাংশ হওয়া পুরো খাতের জন্য চরম লজ্জাজনক। সাধারণ বীমা করপোরেশনের ধীরগতি এবং কিছু কোম্পানীর আর্থিক দুর্বলতার কারণে মানুষ এখন বাধ্য না হলে বীমা করছে না। এই আস্থার সংকটের কারণে দেশে ব্যবসা করা একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বীমা করা বন্ধ করে দিয়েছে। তারা এখন তাদের মূল দেশ থেকে বীমা পলিসি করছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা।
অভিযোগ অস্বীকার সাধারণ বীমা করপোরেশনের : বেসরকারি খাতের এই ‘গলার কাঁটা’ হওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে সাধারণ বীমা করপোরেশন। যোগাযোগ করা হলে সাধারণ বীমা করপোরেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল মতিন বলেন, সাধারণ বীমা করপোরেশন পুনঃবীমার টাকা দিচ্ছে না- এই অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের এখানে কোনো ধরনের আর্থিক বা তহবিল সংকট নেই। মূলত কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ জমা দিতে পারছে না। সঠিক ডকুমেন্ট দিলে আমরা নিয়মিত টাকা পরিশোধ করছি।
/কেএইচও