ইবোলার বিরল বুন্ডিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে তিনটি নতুন টিকা তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে এই ভাইরাসে প্রায় ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
একটি টিকার উন্নয়নে কাজ করা আন্তর্জাতিক এইডস ভ্যাকসিন উদ্যোগ (আইএভিআই) সতর্ক করেছে যে বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা সংক্রমণে পরিণত হতে পারে।
এছাড়া যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্নাও বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে টিকা তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনটি প্রকল্পকেই অর্থায়ন করছে মহামারি প্রস্তুতি উদ্ভাবন জোট (সিইপিআই)। সংস্থাটি বলেছে, এই রোগ মোকাবিলায় প্রতিটি দিনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে এক হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী উগান্ডায় নয়টি সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে যে এই প্রাদুর্ভাব ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা মহামারির মতো রূপ নিতে পারে। ওই সময় প্রায় ২৯ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
আইএভিআই-এর প্রধান ডা. মার্ক ফেইনবার্গ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের সেই মহামারির মতোই গুরুতর, এমনকি আরও খারাপও হতে পারে। তাই দ্রুত টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ (এমএসএফ)ও পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, এত অল্প সময়ে এত বেশি রোগী আগে কখনো দেখা যায়নি।
কেন নতুন টিকা প্রয়োজন
ইবোলার মোট ছয়টি প্রজাতি রয়েছে, তবে এর মধ্যে তিনটি মানুষের মধ্যে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করে। প্রতিটি প্রজাতির জন্য আলাদা টিকা তৈরি করতে হয়।
সবচেয়ে সাধারণ জাইর ইবোলা প্রজাতির জন্য ইতোমধ্যে অনুমোদিত টিকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা বুন্ডিবুগিও প্রজাতির কারণে, যার জন্য এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা নেই।
আইএভিআই জাইর ইবোলা টিকার পরিবর্তিত সংস্করণ তৈরি করছে, যা বুন্ডিবুগিওর বিরুদ্ধে কাজ করবে। বানরের ওপর পরীক্ষায় এই টিকা প্রায় শতভাগ সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছে।
ডা. ফেইনবার্গ জানান, গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও মানবদেহে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু করতে এখনও সাত থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে। তবে তারা এই সময়সীমা কমানোর চেষ্টা করছেন।
মডার্না ও অক্সফোর্ডের উদ্যোগ
মডার্না তাদের এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন টিকা তৈরির কাজ করছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই প্রযুক্তি দ্রুত টিকা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মডার্নার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিফেন বানসেল বলেন, বৈজ্ঞানিক মান বজায় রেখেই দ্রুতগতিতে কাজ করা হবে, যাতে প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীর কাছে সম্ভাব্য টিকা দ্রুত পৌঁছানো যায়।
অন্যদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের নিজস্ব টিকা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ইবোলা টিকা তৈরি করছে। গবেষকদের আশা, দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই এটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হবে।
টিকাগুলো কীভাবে কাজ করবে
তিনটি টিকার লক্ষ্য একই—মানবদেহকে ইবোলার বুন্ডিবুগিও গ্লাইকোপ্রোটিন শনাক্ত করতে শেখানো।
আইএভিআই-এর টিকায় একটি ক্ষতিহীন জীবন্ত ভাইরাস ব্যবহার করা হচ্ছে, যার সঙ্গে ইবোলার গ্লাইকোপ্রোটিন যুক্ত করা হয়েছে।
মডার্না ও অক্সফোর্ডের টিকায় জেনেটিক কোডের একটি অংশ শরীরে প্রবেশ করানো হবে, যা গ্লাইকোপ্রোটিন তৈরি করবে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এর ফলে প্রকৃত ইবোলা সংক্রমণ ঘটলে শরীর আগেই প্রস্তুত থাকবে।
তবে কোন টিকা কতটা কার্যকর হবে, কত ডোজ লাগবে এবং কতদিন সুরক্ষা দেবে— এসব বিষয় জানতে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান
মহামারি প্রস্তুতি উদ্ভাবন জোটের প্রধান নির্বাহী ডা. রিচার্ড হ্যাচেট বলেন, বুন্ডিবুগিও ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো অনুমোদিত টিকা নেই। তাই এই প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, বুন্ডিবুগিওর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা বর্তমান প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতের মহামারির প্রস্তুতিকেও আরও শক্তিশালী করবে।
/ইউএমএইচ