রাজস্বে এবার বড় ঘাটতির আশঙ্কা

জাহিদুল ইসলাম

অর্থনীতি

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থবছরের ৯ মাস শেষে আদায়ের গতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায়

2026-06-02T00:37:35+00:00
2026-06-02T00:37:35+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
রাজস্বে এবার বড় ঘাটতির আশঙ্কা
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম 
সংগৃহীত ছবি
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থবছরের ৯ মাস শেষে আদায়ের গতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি শুল্ক ও অকর রাজস্বে বড় পতন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘কোয়াটার্লি রিপোর্ট অন গভর্নমেন্টস রেভিনিউ রিসিপ্ট : জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬’ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪২১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ আদায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়লেও, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।

সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের তিন-চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। প্রতিবেদন বলছে, দেশের রাজস্ব কাঠামো এখনও প্রায় পুরোপুরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডনির্ভর (এনবিআর)। তৃতীয় প্রান্তিকে মোট রাজস্বের প্রায় ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ এসেছে এনবিআরের কর আদায় থেকে। বিপরীতে নন-এনবিআর কর রাজস্বের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অকর রাজস্বের অংশ ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে এনবিআরের কর আদায়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এনবিআরের কর আদায় হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৩৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ।

এর মধ্যে প্রত্যক্ষ কর বা ডাইরেক্ট ট্যাক্স থেকে আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় উৎস ছিল আয়কর। এই খাত থেকে এসেছে ৩৬ হাজার ৫ কোটি টাকা, যা প্রত্যক্ষ করের প্রায় ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে ভ্রমণ কর থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৬২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

পরোক্ষ কর থেকেও বড় অঙ্কের রাজস্ব এসেছে। এ খাতে আদায় হয়েছে ৬৬ হাজার ৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা মোট এনবিআর করের প্রায় ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস ছিল মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে ভ্যাট থেকে মোট আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

তবে উদ্বেগ তৈরি করেছে আমদানি শুল্কে বড় পতন। প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক আদায় হয়েছে ৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ কম।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পতন আমদানি কমে যাওয়া, শিল্প উৎপাদনে মন্থরতা, ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলায় সীমাবদ্ধতা কিংবা শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

অন্যদিকে ভ্যাট আদায় বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকার ক্রমেই ভোক্তাভিত্তিক করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ বাজারে পণ্য কেনা ও সেবা গ্রহণের মাধ্যমে যে কর দিচ্ছেন, সেটিই এখন সরকারের প্রধান রাজস্ব উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নন-এনবিআর কর রাজস্বেও দুর্বলতা স্পষ্ট। এ খাতে আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ কম। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস ছিল স্ট্যাম্প ডিউটি, যেখান থেকে এসেছে ৯৭৪ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে করবহির্ভূত রাজস্বে। এ খাতে আয় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ কম। বিশেষ করে লভ্যাংশ আয় প্রায় ভেঙে পড়েছে। ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকে যেখানে লভ্যাংশ থেকে ৮ হাজার ২১৭ কোটি টাকা এসেছিল, সেখানে এবার এসেছে মাত্র ২১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে প্রায় ৯৭ শতাংশ পতন ঘটেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে যাওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংক বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ স্থানান্তর কম হওয়া কিংবা আগের বছরের এককালীন আয়ের অনুপস্থিতির ইঙ্গিত হতে পারে।

সরকার ইতিমধ্যেই রাজস্ব বাড়াতে কিছু নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল প্রণয়ন, কর অব্যাহতি কমাতে করব্যয় নীতি চালু, আয়কর রিটার্ন অটোমেশন, ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর পরিশোধ সহজ করা এবং এনবিআরের ডিজিটালাইজেশনে বরাদ্দ বৃদ্ধি।

তবে সার্বিক চিত্রে স্পষ্ট, রাজস্ব আদায়ের মূল ভরসা এখনও ভ্যাট ও আয়কর। কিন্তু আমদানি শুল্ক ও অকর আয়ের দুর্বলতা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারকে হয় কর আদায় বাড়াতে হবে, নয়তো বাড়তি ঋণের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা করতে হতে পারে।

আরবিএন 



  বিষয়:   এনবিআর  বাংলাদেশ ব্যাংক 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: