দ. এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ওয়াশিংটন

এমএকে জিলানী

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট) ও আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট) নামে দুটি সামরিক চুক্তি সইয়ে বাংলাদেশকে

2026-06-02T01:01:19+00:00
2026-06-02T01:01:19+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দ. এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ওয়াশিংটন
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১:০১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট) ও আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট) নামে দুটি সামরিক চুক্তি সইয়ে বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনকে প্রতিহত করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াশিংটন ঢাকাকে এসব চুক্তিতে সম্মত করতে চাইছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থানের কারণে এই গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গভীর সমুদ্র অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ নোঙর করার সুবিধা থাকায় অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) সম্পন্ন করেছে। এ চুক্তির ৪ নম্বর অধ্যায়ে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ‘পরিপূরক ব্যবস্থা’ নেবে। এতে রফতানি নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি দণ্ড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য স্বার্থ’ বিপন্ন করতে পারে। তবে আগে থেকে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় থাকা প্রযুক্তি, উপকরণ বা সরবরাহকারীর ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জয়লাভের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই চিঠিতে এআরটি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সামরিক চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি আশা করি, আপনি নিয়মিত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সম্পন্ন করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন, যা আপনার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সেরা আমেরিকান সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ দেবে।’

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া-বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ৫ থেকে ৭ মে ঢাকা সফর করে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সফরেও সামরিক চুক্তি ও এআরটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, আকসা চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের বন্দর ও এয়ারফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ও সামরিক বিমানের লজিস্টিক সহায়তার জন্য উন্মুক্ত হবে। এতে চীনের ‘চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর’ (সিএমইসি) এবং মালাক্কা প্রণালির বিকল্প রুটগুলো পর্যবেক্ষণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হতে পারে।

মালাক্কা প্রণালি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেÑ এমন আশঙ্কা থেকেই বেইজিং বিকল্প স্থল করিডোর গড়ে তুলছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীনের মিয়ানমারভিত্তিক করিডোরের একটি সহায়ক সংযোগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার ও পাকিস্তান হয়ে গড়ে ওঠা স্থল করিডোরগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে তেল পরিবহনের দূরত্ব ৩ থেকে ৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক অবরোধের পরিস্থিতিতেও এসব করিডর চীনের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

২০১৮ সাল থেকে চীন চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর (সিএমইসি) গড়ে তুলছে। এর আওতায় মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ বন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত ৭৭১ কিলোমিটার তেল পাইপলাইন এবং ৭৯৩ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের উন্নয়নেও চীন বিনিয়োগ করেছে, যাতে বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এসব সামরিক চুক্তি সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট মার্টিনকে ‘লিলি প্যাড বেস’ কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এই কৌশলে বড় স্থায়ী ঘাঁটির বদলে ছোট, অস্থায়ী ও কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। মিয়ানমার উপকূল থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে কিয়াউকপিউ বন্দর এবং সিএমইসির ভারত মহাসাগরীয় প্রবেশপথ নজরদারি করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ উন্নত সামরিক সরঞ্জাম যেমন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বা অ্যাপাচি হেলিকপ্টার পেতে পারে। তবে এর সঙ্গে কঠোর শর্তও জড়িত থাকে। উদাহরণ হিসেবে ২০১৯ সালে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ টানা হয়। সে সময় ভারত দাবি করেছিল, তারা পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ ভূপাতিত করেছে। পরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, পাকিস্তানকে সরবরাহ করা সব এফ-১৬ অক্ষত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এসব চুক্তির আওতায় সরঞ্জাম ব্যবহারের ওপর নিবিড় নজরদারি রাখে।

তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের জন্য উন্নত যুদ্ধবিমান ও সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা প্রয়োজন হলেও এসব চুক্তির শর্ত পূরণ করা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বর্তমান ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যে ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণা করেছে, তার সঙ্গে সামরিক চুক্তিগুলোর কিছু দিক সাংঘর্ষিক হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত সামরিক সরঞ্জাম বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবু এসব সুবিধা গ্রহণের আগে দেশের সামর্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, মহান স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বাংলাদেশ কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি জড়াতে চায় না। তিনি বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে চায়। সামরিক চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকাশ্য আলোচনা ও সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বা উড়োজাহাজ কেনাবেচার চুক্তি হতে পারে, তবে সামরিক খাতে গভীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব ঠেকানো এবং নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করতে আগ্রহী। তার মতে, এ ধরনের চুক্তি হলে বাংলাদেশ বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ‘ঘুঁটি’ হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করা গেলে চুক্তি নিজে সমস্যা নয়। তবে তা একতরফা হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও জিবুতিসহ অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে এবং নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী শর্ত নির্ধারণ করেছে।

তার ভাষায়, ‘প্রতিরক্ষা-বিষয়ক চুক্তিতে ভারসাম্য রক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা না গেলে এমন চুক্তি ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।’

আরবিএন 



  বিষয়:   দ. এশিয়া  ওয়াশিংটন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: