২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। কেরালার এক বিশাল জনসভায় মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভারত তোমাদের বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়েছে এবং আমরা এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করব। আমরা নিশ্চিত করব যে তোমরা সারা বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়ো।’ উরি হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যুর প্রতিশোধের অঙ্গীকারে মোড়ানো এই ভাষণ ছিল পরিষ্কার। এক কৌশলগত বার্তা, এক অহংকারী প্রত্যয়। কিন্তু দশ বছর পর এসে ভূরাজনীতির আয়নায় যে প্রতিবিম্ব ধরা পড়ছে, তা সম্পূর্ণ বিপরীত। একঘরে করার এই মহাপরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে দিল্লির ঘাড়েই।
আজ পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ওয়াশিংটনের অতি আস্থাভাজন, বেইজিংয়ের ‘অক্ষয়’ মিত্র, তেহরান-রিয়াদের মধ্যে অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। কীভাবে এই নাটকীয় পালাবদল ঘটল? এ এক কৌশলী দম্ভের পতনের গল্প, যেখানে প্রতিটি আঘাতই প্রতিঘাত হয়ে জন্ম দিয়েছে গভীরতর বিপর্যয়ের।
কৌশলী সংযম থেকে ‘কৌশলী উন্মাদনা’র পথে : ইতিহাস একটু পেছনে টানা যাক। নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতি খোলার পর ভারত একটি দায়িত্বশীল উদীয়মান শক্তি হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তারা অনুসরণ করছিল ‘কৌশলগত সংযম’ বা স্ট্র্যাটেজিক রেস্ট্রেইন্ট নীতি। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনীতি ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইসলামাবাদকে কোণঠাসা করা।
২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরেও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানে সরাসরি আক্রমণ চালায়নি, যা নিয়ে তখনকার বিরোধী দল বিজেপি তীব্র সমালোচনা করেছিল। ক্ষমতায় এসে মোদি প্রথমে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলেন বটে। নওয়াজ শরিফকে শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, লাহোরে আকস্মিক সফর এসব ছিল তার স্টান্টবাজি। কিন্তু ২০১৬ সালের পর দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে যায়। ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না’ এই মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে দিল্লি একরোখা পথ ধরল। অথচ এই পথ ধরেই একে একে ভুল সিদ্ধান্তের বীজ বপন করা হয়েছিল, যার ফল আজ হাতে এসে পৌঁছেছে।
সার্কের পতন ও প্রতিবেশীই প্রথম নীতির শেষকৃত্য : ২০১৪ সালে মোদির শপথগ্রহণে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের নেতাদের উপস্থিতি ছিল এক কূটনৈতিক মহোৎসব। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ ধারণা তখন উচ্চারিত হচ্ছিল গর্বের সুরে। কিন্তু ২০১৬ সালের পর যখনই পাকিস্তানকে একঘরে করার মরিয়া চেষ্টা শুরু হলো, ভারত কার্যত নিজেই নিজের পা কেটে বসল। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে দিল্লি।
ফল? সেই ২০১৬ সালের পর আর কোনো সার্ক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তানকে ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রধান প্ল্যাটফর্মটিকে একক স্ট্রোকে অচল করে ভারত আসলে নিজের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক স্থাপত্যকেই ধুলোয় মিশিয়ে দিল। বিকল্প হিসেবে বিমসটেককে সামনে আনা হলেও সেটি এখনো ম্রিয়মাণ।
কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদের কথাটি এখানে ভীষণ প্রাসঙ্গিক : ‘পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে ভারত কার্যকরভাবে সার্ককেই বিসর্জন দিয়েছে।’ অর্থাৎ একঘরে করার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতিবেশীদেরই ঘরভাঙা ইট নিজের পায়ে ফেলেছে ভারত।
বাংলাদেশের পালাবদল : এ কেবল সার্কেই থেমে থাকেনি। পাকিস্তানকে চাপে ফেলতে ভারত সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছিল বাংলাদেশের ওপর। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ঢাকা ছিল দিল্লির অকৃত্রিম কৌশলগত সহযোগী। কিন্তু এই নির্ভরতার ভিতটা ছিল এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। দিল্লির পররাষ্ট্রনীতির চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তখনই, যখন ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে উষ্ণ হতে থাকে। একদা যে বাংলাদেশ ভারতের পাকিস্তানবিরোধী কূটনীতির স্তম্ভ ছিল, সেখানেই এখন ভারতের ‘হস্তক্ষেপবাদী’ তকমা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিবেশীর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে না পারার এই অক্ষমতা প্রমাণ করে, কাউকে একঘরে করতে গেলে নিজেকেও সঙ্গীহীন হতে হয়।
পেহেলগাম, যুদ্ধবিরতি ও ট্রাম্পের কার্ড : বৈশ্বিক মঞ্চে পাকিস্তানকে একঘরে করার মোদির কৌশল সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ২০২৫ সালের মে মাসে, সেই ভয়াবহ চার দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পেহেলগামে ২৬ পর্যটক হত্যার জেরে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালালে যে সংঘাত বাধে, তাতে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এখানেই আখ্যানের মোড় ঘুরে যায়।
মোদি যে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসের কারখানা’ বানিয়ে বিশ্ববাসীকে ভারতের পক্ষে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, বাস্তবে তা উল্টো ফল দিল। আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যানের পর্যবেক্ষণ নিখুঁত : ‘বিশ্ব পিছিয়ে গিয়ে ভারতকে হামলার জন্য উৎসাহিত করেনি... বিশ্বনেতারা লক্ষ করেছেন যে পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ ভারত দিতে পারেনি।’ অর্থাৎ বৈশ্বিক আখ্যানের লড়াইটায় ভারত চূড়ান্তভাবে হেরে গেল, আর পাকিস্তান নিজেকে সফল আত্মরক্ষাকারী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনে সক্ষম হলো।
এই পরাজয় আরও গাঢ় হয়েছে ট্রাম্প ফ্যাক্টরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে একের পর এক ঘোষণা দিতে থাকলেন, তখন মোদির নীরবতা ও পরে দ্বিপক্ষীয়তার দাবি হয়ে দাঁড়াল এক ভয়াবহ কূটনৈতিক ভুল। ট্রাম্পের দাবি তিনি একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতাও পায়।
অথচ মোদি সেই কৃতিত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ট্রাম্পের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলেন, যা দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কে চিড় ধরায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারত্বকে তীব্র চাপে ফেলে। বুমেরাংয়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ফলাটি এখানেই। পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ ট্রাম্পের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে, তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয় এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ পাইয়ে দেয়।
ট্রাম্প যাকে বলতে শুরু করেন ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’, ভারত যাকে বলে সন্ত্রাসবাদের রূপকার। একই টেবিলে বসে ট্রাম্পের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলা সেই মুনিরই হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার জীবন্ত প্রতীক। একঘরে করার বদলে পাকিস্তান হয়ে উঠল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রশংসার পাত্র, আর ভারত হয়ে পড়ল এক অস্বস্তিকর উপেক্ষিত পক্ষ।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মৃত্যু এবং জোটনিরপেক্ষতার কবর : কেবল পাকিস্তানের উত্থানই নয়, একই সঙ্গে ভারত নিজেই নিজের পুরোনো শক্তিগুলো ধ্বংস করেছে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা থেকে সরে এসে ভারত আজ এক লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে, যা তাকে ইরান নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা, রুশ তেল বন্ধ করা এবং ইসরাইলের অন্ধ মিত্রে পরিণত করেছে।
এই যে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ত্যাগ করে অন্যতম মহাশক্তির আজ্ঞাবহ হয়ে এটি দক্ষিণ এশিয়ার নেতা হিসেবে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে খর্ব করেছে। দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক যেমন লিখেছেন, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ‘ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের গর্বিত মূলনীতির ওপর বড় আঘাত’। একই সঙ্গে, মোদির অধীনে ভারতের ইসরাইলঘেঁষা অবস্থান, ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভোটদানে বিরত থাকা এবং গাজায় গণহত্যা নিয়ে নীরবতা মুসলিম বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
ঠিক সেই শূন্যস্থানেই পাকিস্তান নিজেকে মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছে, যা সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগে দিল্লি যখন আন্তর্জাতিক তিরস্কার কুড়োচ্ছে, ইসলামাবাদ তখন ১৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘে স্বীকৃতি আদায় করে একটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
বাণিজ্য, খনিজ ও ক্রিপ্টো : পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থান কেবল প্রতিরক্ষা বা ধর্মীয় সংহতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি বিরল খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খনির মতো উদীয়মান প্রযুক্তির ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পাকিস্তানের খনিজ সম্পদের দিকে ঝুঁকছে। পাকিস্তানের সাবেক জাতিসংঘ দূত মাসুদ খানের ভাষায়, এ এক ‘চতুর কূটনীতি’।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ, শুল্ক চাপ, এইচ-১বি ভিসা বন্ধ এবং ট্রাম্পের ‘মাগা’ শিবিরের প্রকাশ্য ভারত বিদ্বেষ এসব মিলিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন এক তিক্ত বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প দিল্লির বদলে বেইজিং ও তেহরানের দিকে ঝুঁকছেন, আর ইসলামাবাদ সেখানে নিজেকে সেতু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
যে দর্প থেকে শিক্ষা অনিবার্য : ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জাতিকে চিরকাল একঘরে করে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষত যখন সেই জাতি ভূরাজনীতির অঙ্কে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে জানে। মোদির পাকিস্তাননীতি ছিল একাংশে প্রতিশোধের আকাক্সক্ষা, একাংশে হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের অভিক্ষেপ। কিন্তু শক্তির এই অহংকারী প্রদর্শন আঞ্চলিক কাঠামো ভেঙেছে, বন্ধু হারিয়েছে, কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্রেরই সমর্থন থেকে বঞ্চিত করেছে। পাকিস্তানের পুনরুত্থান কেবল তাদের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ নয়, এটি ভারতের জন্য এক চরম আত্মসমালোচনার আহ্বান। কাশ্মির এখনও জ্বলন্ত ইস্যু, সীমান্তে এখনও রক্ত ঝরে, কিন্তু পথ একটাই সংলাপ।
সম্প্রতি দুই দেশের সাবেক সেনাপ্রধান ও কূটনীতিকদের গোপন বৈঠক হয়তো সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। কিন্তু ভূরাজনীতির এই বুমেরাং যে শিক্ষা দিয়ে গেল, তা হলো কাউকে মাটিতে ফেলতে গেলে নিজেকেও কাদায় নামতে হয়। আর সেই কাদায় আটকে যাওয়ার দৃশ্য আজ বিশ্ব দেখছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, অহংকারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়াই হবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর জন্য একমাত্র টেকসই পথ। নয়তো একঘরে করার এই ফন্দি আরও একবার ইতিহাসের নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের জন্ম দেবে, যেখানে ঘর ভাঙার হাতিয়ারই একদিন নিজের দরজায় আঘাত হানে।
আরবিএন