স্বপ্নাকে বারবার বলার পরেও সে দরজা খোলে নাই

আদালত প্রতিবেদক

আইন-আদালত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন রামিসার মা পারভীন

2026-06-02T13:34:30+00:00
2026-06-02T13:35:13+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আইন-আদালত
রামিসার মায়ের সাক্ষ্য
স্বপ্নাকে বারবার বলার পরেও সে দরজা খোলে নাই
আদালত প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১:৩৪ পিএম  আপডেট: ০২.০৬.২০২৬ ১:৩৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন রামিসার মা পারভীন আক্তার।

মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে হাজির হয়ে তিনি সাক্ষ্যপ্রদান করেন।

আদালতে পারভীন আক্তার বলেন, ‘আমি বারবার স্বপ্নাকে কেঁদে বলি। বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। কিন্তু খোলে নাই। পরে দরজা ভাঙতে হয়। ভিতরে গিয়ে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই।’

পারভীন আক্তার আদালতে আরও বলেন, ‘আমি গৃহিণী। গত ১৯ মে সকালে এ ঘটনা ঘটে। আমি তখন রান্না করছিলাম। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ের নাম রাইসা আক্তার। রাইসাকে ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে বললাম, তার চাচা গোলাম মোস্তফার বাসায় যেতে। তখন ছোট মেয়ে রামিসা বলল, আম্মু আমিও আপুর সাথে যাব। আমি তাকে যেতে না করি।’

এরপর আমি আবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে যাই। পরে বড় মেয়ে চাচার বাসায় যায়। ছোট মেয়েকে নেয়নি। রাইসাকে বলে তুমি রুমে থাক। এটা আমি রান্না ঘর থেকে শুনতে পাই। পরে রাইসা তাকে নিয়ে চাচার বাসায় যায় কিনা জানতাম না, আদালতে বলেন রামিসার মা।
আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, ‘একটুর পর আমি রান্নাঘর থেকে একটা বাচ্চার চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। পাশের ফ্ল্যাটের আসামি সোহেলদের বাসায় বাচ্চা নেই জানতাম। তবে একটু পর রুমের বাইরে বের হলাম। কাউকে পেলাম না বাইরে। এর ৩-৪ মিনিট পর রাইসা একা তার চাচার বাসা থেকে আসে। আমি রাইসাকে বললাম, তুমি একা কেন। রামিসা কোথায়? রাইসা বলে, সে তো আমার সাথে যায় নাই। নিচে গেছে মনে হয়। নিচে গিয়ে দেখি রামিসা নাই। আশপাশে সবাইকে জিজ্ঞেস করি, রামিসাকে দেখছেন। সবাই বলে, না দেখি নাই।’

পারভীন আক্তার বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের নিচে অফিস রুম ভাড়া একটা। সেটার দরজা খুলে দেখলাম, মেয়ে আছে কিনা। কিন্তু পাইনি। দোতলায় ব্যাচেলর ভাড়া দিছে। সেখানেও খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। পরে তিনতলায় সোহেলদের রুমে ধাক্কা দিলাম। খুললো না। পরে তাদের দরজার সামনে দেখলাম মেয়ের একটা জুতা পড়ে আছে। তখন মনে হলো আগে একটা বাচ্চার চিৎকার শুনছিলাম, ওই বাচ্চার চিৎকার কি আমার মেয়ের? তাহলে কি আমার রামিসাকে এখানে আটকে রেখেছে?’

এরপর দরজা খোলার জন্য বারবার ধাক্কাতে থাকেন উল্লেখ করে রামিসার মা বলেন, ‘কিন্তু কেউ খোলে না। পরে পাঁচতলার মনির ও আসমা নামে এক মহিলা এলো। এরপর একে একে অনেক লোকজন এলো। সবাই দরজা খোলার কথা বলে। কিন্তু আসামিদের কেউ খোলে না। পরে মনিরকে বললাম, নিচে যান। আরও মানুষ ডেকে আনেন। তিনি নিচে গিয়ে ১০-১২ জনকে ডেকে আনেন। তখন আমি আমার স্বামীকে বারবার ফোন দিতে থাকি। উনাকে বলি, আমাদের রামিসাকে পাচ্ছি না। স্বামী তখন অফিস থেকে আসে। ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসে।’

পারভীনা আক্তার সাক্ষ্যতে বলেন, ‘তখন সবাই দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দরজার গোল বোল্ড লক ভাঙা হয়। ভাঙা লকের ছিদ্র দিয়ে দেখি বাথরুম খোলা। ভিতরে কি রক্ত। রাজু নামে একটা ছেলে সেটার ভিডিও করে। আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। তখন আমি আসামি স্বপ্নাকে ভিতরে হাঁটতে দেখি। আমি বাইরে থেকে স্বপ্নাকে বারবার বলতে থাকি, বইন দরজাটা খোল। দরজাটা খোল। আমি তোকে কিছু বলব না। কাঁদতে থাকেন মা পারভীন।’
আরও পড়ুন

পারভীন আরও বলেন, ‘এরপর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা এক জায়গায় আর দেহ আরেক জায়গায়। মাথা বাথরুমে বালতিতে। আর দেহ আসামিদের রুমের খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। পরে পুলিশ এসে মেয়ের মরদেহ, জামা-কাপড় সব নিয়ে যায়।’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু রামিসার মায়ের কাছে জানতে চান, তখন স্বপ্নার কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলেন কিনা? পারভীন বলেন, ‘তখন অনেক মানুষজন ঢুকে পড়ে। আমি তার কাছে কিছু জানতে পারি নাই। তারা স্বপ্নার কাছে জিজ্ঞাসা করছিল।’

পিপি আরও বলেন, ‘দেখেন তো এখানে স্বপ্না আছেন কিনা।’ তখন পারভীনা কাঠগড়ার দিকে হাত দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, ওই যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। আমি কত বলছি, বইন দরজাটা খোল, দরজাটা খোল। কিন্তু খোলে নাই সে।’

এ কথা বলে কাঁদতে থাকেন রামিসার মা। এরপর রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ তাকে জেরা করেন। এদিন প্রথমে রামিসার বাবা সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হলে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রামিসার মা পারভীন আক্তার সাক্ষ্য দেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আদালত বিরতিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহন শেষ হয়।

এ সময় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না বেগমকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়।

গত ১ মে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন আদালত। এর আগে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আসামিদের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

এএডি/


  বিষয়:   স্বপ্না  দরজা  রামিসা  মা  সাক্ষ্য 


Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: