যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক পুশ-ইনের শিকার ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু এখনও সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করছেন।
সোমবার (১ জুন) সন্ধ্যায় এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে আজ মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে চরম আতঙ্ক আর মানবেতর দিন কাটছে এই মানুষগুলোর।
এর আগে রোববার (৩১ মে) গভীর রাতে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টের উত্তরে সাদিপুর খড়ের মাঠ সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের গেট খুলে এই ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের কঠোর প্রতিরোধের মুখে তারা জিরো লাইনেই আটকে পড়ে।
সীমান্তের ওপার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় কয়েকটি ট্রাকে করে অতিরিক্ত বিএসএফ সদস্যের পাহারায় প্রায় ১২০ জনকে পুশ-ইনের উদ্দেশ্যে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে আসা হয়। এরপর ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে ১০-১২ জন করে মানুষকে ভারতের জয়ন্তীপুর সীমান্তে আনা হয়। প্রথমে তারা সাদিপুর-রঘুনাথপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের জয়ন্তীপুর সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবির প্রবল বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে রাতভর আশপাশের বেশ কয়েকটি কাঁটাতারের গেট খুলে তাদের পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পুশ-ইনের সময় বিএসএফ তাদের সীমান্তের সব সার্চলাইট ও লাইটিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, যাতে অন্ধকারের সুযোগ নেওয়া যায়। কিন্তু দূরদর্শী বিজিবি সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে নিজস্ব টর্চ ও সার্চলাইট জ্বালিয়ে পুরো সীমান্ত এলাকা আলোকিত করে তোলেন। এর ফলে বিএসএফের দফায় দফায় নেওয়া চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাদিপুর এলাকার সীমান্ত পিলার ১৯/এস-৬ এর কাছে ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে কাঁটাতারের বেড়া পার করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিজিবি আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকায় তারা আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেনি।
বিজিবি সূত্র জানায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন বা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। সেই সন্দেহ থেকে সীমান্তজুড়ে অতিরিক্ত টহল, নজরদারি ও মাইকিং অব্যাহত রেখেছে বিজিবি।
বিজিবি যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, ‘এটি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় যা চাইলেই দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। পতাকা বৈঠকে বিএসএফ দাবি করছে এই লোকজন তাদের দেশের নয়। কিন্তু পুশ-ইনের সময়কার ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে বিএসএফই এদের ঠেলে দিয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগীরা নিজেরাও জানিয়েছেন বিএসএফ তাদের জোর করে এখানে এনেছে। সমস্ত প্রমাণ থাকার পরও বিএসএফ বিষয়টি মানতে চাইছে না।’
বর্তমানে জিরো লাইনে আটকে থাকা ক্ষুধার্ত ও আতঙ্কিত মানুষগুলোর মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবে মানবিক কারণে বিএসএফ তাদের পানি ও শুকনো খাবার সরবরাহ করছে বলে জানা গেছে।
বিজিবি অধিনায়ক আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘আটকে থাকা ব্যক্তিরা যদি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হন, তবে নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ সাপেক্ষে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের হস্তান্তর করতে পারে, আমরা তাদের গ্রহণ করব। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক কাউকে সীমান্ত পার করার সুযোগ দেওয়া হবে না। বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।’
সময়ের আলো/জেডি