জনকোলাহলে

মাহমুদুর রহমান

সাহিত্য

শাহবাগের মোড়টা থেকে সব সময়ই দূরে দাঁড়ানোর অভ্যাস। গত এক দশকে শাহবাগ নানা কারণে দেশ বা নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে

2026-06-02T18:47:16+00:00
2026-06-02T18:47:16+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
জনকোলাহলে
মাহমুদুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শাহবাগের মোড়টা থেকে সব সময়ই দূরে দাঁড়ানোর অভ্যাস। গত এক দশকে শাহবাগ নানা কারণে দেশ বা নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আফজাল করিমের সে বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে মোড়টা থেকে তিনি বরাবরই দূরে দাঁড়াতে চান। ঢাকায় প্রথম এসে ওখানে একবার তার পকেট কাটা গিয়েছিল। সেটা নব্বইয়ের শুরু। তেত্রিশ বছর কেটেছে তারপর। সুনীলের কবিতা মনে পড়ল আফজালের। তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি।

এক সময় বন্ধুবান্ধব ঠাট্টা করত তাকে। কেননা সবার সঙ্গে থাকলে বহুদিন বাসের জন্য দাঁড়াতে হয়েছে। আফজাল সরে দাঁড়াতেন একটু। তা নিয়ে হাসাহাসি। আর একা থাকলে মিস করতেন বাস। কেননা বিএসএমএমইউর সামনে দাঁড়াতে চাইত না কোনোটা। এখন তাই একটু খুশিই হন। মিরপুর যেতে তাকে আর দাঁড়াতে হয় না অপ্রিয় জায়গাটায়। বারডেম থেকে বেরিয়ে সহজেই ঢুকে যেতে পারেন মেট্রো স্টেশনে। 

প্রতিদিনের মতো আজও তাই করলেন আফজাল। এক পশলা ঝুম হওয়ার পর চলতে থাকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচিয়ে তিনি উঠে গেলেন সিঁড়িতে। টের পাচ্ছিলেন কিছু একটা গড়বড় আছে। গাট ফিলিং! উপরে উঠেই বুঝলেন সেটা। যান্ত্রিক কোনো একটি ত্রুটির কারণে আজ ট্রেন লেট। ট্রেন আছে, ছাড়ছে না।

ক্ষতি নেই কোনো তার। বাড়িতে যাবেন। সেখানে এমন কোনো কাজ নেই। শায়লা বারডেমে ভর্তি প্রায় সাতদিন। এখন বাড়িটা তার কাছে ফাঁকা লাগে। কারণ সাবিত তো তিন বছর হয় সিলেটে। শারমিনকে রেখেছেন মুনিয়ার বাসায়। একা একা এখন তিন রুমের ফ্ল্যাটটা তাকে হা করে গিলতে আসে।

সে তুলনায় মেট্রো স্টেশন বেশ ভালো। সরগরম। লোকজন হৈ হট্টগোল করে না কিন্তু এক জায়গায় অনেক মানুষ থাকলে সাধারণ কথাও হট্টগোলের মতোই লাগে। শায়লাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর এক ভীষণ শূণ্যতা অনুভব করেছিলেন আফজাল। সে শূন্যতার অনুভব একটু কম হয় স্টেশনে।

হাসপাতালেও অনেক লোক। অনেক শব্দ কিন্তু সেখানে একটা ভীতি থাকে। এই বুঝি কান্নার আওয়াজ আসে। এই বুঝি কেউ ঝগড়া করে বসে হাসপাতালের কোনো স্টাফের সঙ্গে। ব্যাংক কর্মচারী আফজালের সেসব ভালো লাগে না। তারচে স্টেশনে হরেক মানুষের চাল, চেহারা, ব্যস্ততা দেখতে ভালো লাগে তার।

আফজাল দেখেন চলন্ত সিঁড়িতে বছর পঁচিশের এক জুটি। ছেলেটা কোমর জড়িয়ে রেখেছে মেয়েটার, আলত করে। চারপাশটা বদলে গেছে অনেক, আফজাল জানেন। তিনি কখনো শায়লার কোমর ধরেননি বাড়ির বাইরে। এমনকি শেষবার—জীবনে একবারই—ভারতে বেড়াতে গিয়ে, সমুদ্রসৈকতে হাফপ্যান্ট পরা নারী পুরুষের মধ্যেও তিনি পারেননি।

সেদিন শায়লা পরেছিল সাদার ওপর ফুল ছাপা একটা কামিজ। সেই সঙ্গে চুরিদার। মধ্য ত্রিশের শায়লা আর চল্লিশ শুরুর আফজাল তখন অনেকটাই ধীর। যৌবনের শেষ আলোড়ন তাদের মধ্যে খানিকটা দোলা দিয়েছিল। কিন্তু দুই সন্তানের জনক জননী সাত দিনের সফর নামিয়ে এনেছিলেন পাঁচ দিনে। 

ফিরে এসেই যেন শায়লা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। সাবিতের বয়স তখন বারো আর শারমিনের আট। সফর সংক্ষেপ করে ফিরে আসার সেই ঘটনা সাবিত মনে রেখেছে এখনও। এই তো মাস দুই আগে খাবার টেবিলে বলছিল, ‘তোমরা আবার একটা ট্যুর দাও না! আগের বার তো আম্মু হাউমাউ করতে করতে চলে আসল।’

শায়লা চোখ বড় করে শাসনের সুরে বলেছিল, ‘ফাইজলামি করিস না। বাপ মায়ের সাথে বেয়াদবি, না?’ বলতে গিয়ে নিজেও হেসে ফেলে শায়লা। রুটির সঙ্গে সব্জি নিয়ে আফজালও হাসছিলেন। একটু থেমে সে নিজেও বলেছিলেন, ‘আসলেও তো। অনেক দিন হয় কোথাও যাই না। সেই হয়, তোমাদের বাড়ি, নাহলে আমাদের বাড়ি। এবার একটু কোথাও যাওয়া যায়।’

শারমিন লাফিয়ে উঠে বলেছিল, ‘বাবা চলো মালদ্বীপ যাই।’

হায়হায় করে উঠে শায়লা বলেছিল, ‘আরে কী ভয়ানক। বেড়ানোর কথা শুনে সাজেক, কক্সবাজার না একেবারে মালদ্বীপ!। কত টাকা খরচ, জানিস?’

মিইয়ে গিয়েছিল শারমিন। আফজাল বিষয়টা একটু ঠিক করার জন্য বলেছিলেন, ‘যাব যখন দূরেই যাই। মালদ্বীপ না হোক, দার্জিলিং। সমুদ্র না হোক, চা বাগান।’

সাবিতের ভোট পাওয়া গেল। শারমিনও অখুশি হয়নি। শুধু শায়লারই মুখে ছিল চিন্তার ছাপ। সেটা সব সময়ই থাকে। সেই ভেবে আফজাল ঘাটাননি আর। পরদিন থেকে নিজে নিজেই পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দশ দিনের মাথায়ই যে শায়রার অসুখের খবরটা পাবেন, তিনি জানতেন না। শায়লাও না।

ঘোষণা শুনে চিন্তার ঘোর কাটে আফজালের। তাকিয়ে দেখেন সামনে। কিছু মানুষ হতাশার প্রকাশ করে। কেন?

জানা যায়, বৃষ্টির জন্য মেট্রোর দেরী হবে আরো অনেকটা সময়। তাই তারা নেমে যায়। কেউ হয়ত বাসে উঠবে, কেউ সিএনজি ধরবে। আফজাল কী করবেন চিন্তা করেন। কিন্তু চিন্তা করতেও তার ইচ্ছা হয় না। সামনে তাকিয়ে দেখেন একটা ছেলে ফোন তুলে ভিডিও করছে। ভিডিও বা লাইভ, কিছু একটা হবে। সে বলে যাচ্ছে কেমন করে কী কারণে ট্রেন লেট।

তাকিয়ে দেখেন, আরো খানিকটা সামনে একটা মেয়ের মন গলাতে চেষ্টা করছে তার প্রেমিক। হাত জোড় করার দৃশ্যও দেখেন তিনি। সন্ধ্যার মুখে তাদের মধ্যে কী এমন সমস্যা হলো জানতে খুব ইচ্ছা করে আফজালের। কিন্তু তিনি এগিয়ে যান না, কোনো গল্পও তৈরি করেন না। তবে মনে হয়, ক্যাশের নতুন ছেলেটা, জহির যার নাম, ওকে বললে একটা গল্প লিখতে পারবে এ নিয়ে।

পঞ্চাশ পার করেছেন আফজাল। চুলে পাক ধরেছে বেশ ভালোই। কিন্তু বুড়িয়ে যাওয়া যাকে বলে তেমনটা হয়নি। আফজাল নিজের ফোন বের করে। চার মাস আগে কেনা ফোনটা। বেশ শখ করে কেনা। বয়সের তুলনায় সে প্রযুক্তি নিয়ে বেশ আগ্রহী। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বা ফোনে ছবি তোলার মতো সময় বা ইচ্ছা তার হয় না। এক সময় ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল। সাবিত একটা অ্যাপ চিনিয়ে দিয়েছিল আফজালকে। পেন কিংবা আঙুলের আঁচড়েই ছবি আঁকা যায়।

অ্যাপ খুলে কয়েকটা আঁচড় কাটলেন আফজাল। তারপর আরো কয়েকটা। ততক্ষণে অযত্নে বর্ধিত চুলগুলো চোখের সামনে এসে পড়ে। এক হাতে চুল সরান তিনি। তার পরই মনোযোগ টুটে যায়। কিংবা সত্যিকারের মনোযোগ আসে। আর তিনি বুঝতে পারেন, শায়লার হসপিটালের বেডটা এঁকে ফেলছিলেন।

কতটা সময় গেছে? প্রায় ১৫ মিনিট? আফজাল বুঝতে পারেন ট্রেন চলছে। একটা বা দুটো চলেও গেছে। পরের ট্রেনটা আসলে তিনিও যেতে পারবেন। কিন্তু আফজাল ঠিক করলেন তিনি এই ট্রেন ধরবেন না।

স্টার পেরিয়ে গেলেন আফজাল। বৃষ্টি শেষের রাস্তায় গাড়ির জট লেগেছে অনেকক্ষণ হয়। বৃষ্টি এখন নেই তবে পাথে জমা পানিতে গাড়ির লাইটের প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকদিন পর আফজালের একটা সিগারেট খাওয়ার তৃষ্ণা পায়। কিন্তু সিগারেট তিনি ধরান না। একবার থমকে গিয়ে তাকান সার সার বাসগুলোর দিকে। কোনোটা ভরতি, কোনোটায় একটু ফাঁকা আছে। কোনোটার দরজার হাতল ধরেও ঝুলে আছে মানুষ। একটা ছেলে এরই মধ্যে পেয়ারা বিক্রি করছে।

জুতার পেছনে চলকে ওঠা কাদা এসে লাগছে প্যান্টের পেছনের দিকে। আফজাল টের পান কিন্তু পরোয়া করেন না। তার মনে পড়ে গ্রামের রাস্তার কথা। আষাঢ়ের বৃষ্টিতে এক হাঁটু কাদা জমত। তা পার করে হাটে যেতে হতো। বেশিদিন আগের কথা তো না। মাত্র ত্রিশ বছর। কোথা থেকে পার হয়ে গেল তার হদিশ পান না।

এখানে, এই শহরে জীবনের আধেকটা পার করে দিলেন আফজাল। আজ তার মনে হয় শহরটা দেখা হয়নি। অন্তত বিগত সাত-আট বছরে তো একদমই না। কেবল কাজ করেছেন। সংসার করেছেন। শহরটাকে দেখেছেন মোবাইলে, টেলিভিশনের পর্দায়। আজ এতটুকু হেঁটে ক্লান্ত লাগে তাই। কিন্তু মনে হয় সবার সঙ্গে, ভিড়ের মধ্যে হাঁটলে ভালো লাগবে।

একজন পাশ কাটিয়ে গেল তার। একজন এলো উল্টো দিক থেকে। সামনে একজনের গেল পা পিছলে। আফজালের ভালো লাগে দেখতে। ডেবিট-ক্রেডিট, স্কুলের ফি, বিদ্যুতের বিল, ওষুধের নাম মনে থাকে না আর তার। আশেপাশে তাকিয়ে মনে হয় তিনি জহিরের মতো লিখতে না পারলেও অনেকগুলো গল্প দেখতে পাচ্ছেন। কালো বোরখার নারীটি পেরিয়ে যাওয়ার সময় তার হাতে গুঁজে দিল না কোনো কার্ড। কিন্তু তার হাতে ধরা বড় বাজারের ব্যাগে কী থাকতে পারে?

ফার্মগেটের ওভারব্রিজটা করা হয়েছে নতুন করে। আগে এখানে এলেই ভিখারি আর রূপোপজীবিনীদের দেখা মিলত। রাত নটার ফার্মগেটে আজও সেই একই চেহারা দেখলেন আফজাল। কিছু বিষয় হয়ত কখনও বদলায় না।

শেষ পর্যন্ত সিগারেটটা ধরিয়েই ফেলেন। ব্রিজ থেকে নেমে একটা টঙ থেকে। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমি কি এসকেপিস্ট?’ 

স্ত্রীর অসুস্থতা আফজালের মধ্যে তৈরি করেছিল একটা দোলাচল। হাসপাতাল ভয় লাগত তার। যেমন ভয় লাগত শাহবাগের মোড়টা। কিন্তু সেই হাসপাতালেই কেটেছে গত কিছুদিন। শায়লার প্রতিও কি একটা বিরাগ তৈরি হয়েছিল? আফজাল বুঝতে পারেন না। সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বরং মনে হয়, তিনি আসলে নিজের গুমটিঘর থেকে বের হননি অনেকদিন। নিয়মিত জীবনের বাইরে এসে আজ তাই দ্বিধান্বিত, খানিকটা উদভ্রান্ত।

ফের আফজাল তাকান সামনে। এখনো বহু মানুষ পথে। তাদেরও কোনো না কোনো গল্প আছে। সেই হাজার গল্পে একটা হয়ে তিনি ফের মিশে যান সকলের মধ্যে। মানুষের ভীড়ে। আফজালের মাথায় আর কোনো স্বর ধ্বনিত হয় না।


  বিষয়:   জনকোলাহলে  মাহমুদুর রহমান 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: