চীনের দুই হাজার বছরের পুরনো একটি পাহাড়ি জনপদ ফুরং। এর বুক চিরে বয়ে গেছে নয়নাভিরাম ইউশুই নদী। দেখে মনে হবে, রূপকথার শহর। ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় আজও খুব যত্নে ধরে রেখেছে শহরটি। পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের ঘর, রাত নামলে জ্বলে ওঠা লাল লণ্ঠনের আলো— আধুনিক নগরায়নের দ্রুতগতির চীনের ভেতরেও যে এমন প্রাচীন জনপদ আছে, তা ভাবাই যায় না।
ফুরং শহরটি অবস্থিত চীনের হুনান প্রদেশে, ইয়ংশুন অঞ্চলে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। তবে ফুরংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো— জলপ্রপাতের ওপর ও পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটি গ্রাম। এই জনপদে গেলে মনে হবে, সময় যেন একটু ধীরে চলে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার বাইরে, ফুরং এক টুকরো শান্তি— যেখানে জলধারার শব্দ আর প্রাচীন কাঠের ঘর মিলে বলে যায় বহু পুরোনো গল্প। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, পাহাড়ের কিনারায় কাঠের ঘরগুলো ঝুলে আছে, নিচ দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে যাচ্ছে জলধারা। বর্ষাকালে জলপ্রপাত আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, শীতকালে কুয়াশার আবরণ গ্রামটিকে রহস্যময় করে তোলে।
আগে ফুরংয়ের নাম ছিল ‘ওয়াংছুন’। নদী ও পাহাড়ি পথের কারণে এটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চীনা চলচ্চিত্র ‘হিবিস্কাস টাউনের’ সাফল্যের পর গ্রামটির নাম বদলে ‘ফুরং’ রাখা হয়। ‘ফুরং’ শব্দের অর্থ হিবিস্কাস ফুল। সিনেমার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলকে ব্যাপক পরিচিতি দেয় এবং এটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থানে পরিণত হয়।
ফুরংয়ের স্থাপত্যে রয়েছে প্রাচীন চীনা নান্দনিকতার ছাপ। পাহাড়ের ঢালে তৈরি কাঠের বাড়িগুলো সাধারণত বহুস্তরবিশিষ্ট, নিচে পাথরের ভিত্তি এবং ওপরে খোলা বারান্দা। রাতের বেলায় গ্রামের সৌন্দর্য যেন আরও ফুটে ওঠে। সরু পাথরের রাস্তায় ঝুলতে থাকে লাল লন্ঠন, দোকান থেকে ভেসে আসে স্থানীয় খাবারের গন্ধ, এসবের সঙ্গে জলপ্রপাতের শব্দ মিলে তৈরি করে এক মোহনীয় পরিবেশ।
গ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো— জলপ্রপাতের পেছন দিয়ে হাঁটার রাস্তা। পর্যটকেরা জলধারার পেছনে দাঁড়িয়ে পুরো গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা ফুরংকে চীনের বহু ঐতিহাসিক জনপদ থেকে আলাদা করে।
ফুরং শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, স্থানীয় জাতিগত সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূলত তুজিয়া এবং মিয়াউ জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোকসংগীত, নৃত্য এবং উৎসব এই অঞ্চলকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। পর্যটকেরা স্থানীয় বাজার থেকে তৈরি হস্তশিল্প, রূপার অলংকার ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক দেখতে ও সংগ্রহ করতে পারেন। খাবারের মধ্যেও আছে ভিন্ন স্বাদ— ঝাল, ধোঁয়াটে এবং গাঁজানো উপকরণের ব্যবহার এখানে খুব জনপ্রিয়। স্থানীয় টোফু, নুডলস এবং পাহাড়ি ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে রান্না করা খাবার পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
ফুরং শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুরংয়ের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের আলোয় আলোকিত গ্রাম ও জলপ্রপাতের দৃশ্য অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ফুরং গ্রাম এক অদ্ভুত ভারসাম্যের প্রতীক— একদিকে পর্যটননির্ভর আধুনিক অর্থনীতি, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন জীবনধারা। নতুন হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন সুবিধা যুক্ত হলেও গ্রামটি তার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘর, সরু রাস্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। চীনের দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ফুরং যেন মনে করিয়ে দেয়— উন্নয়ন মানেই পুরোনোকে মুছে ফেলা নয়; বরং ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়েও ভবিষ্যতের দিকে এগোনো সম্ভব।
/মহু