দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠিতে তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। প্রখর রোদে দগ্ধ করা গরম আর গরম বাতাস উপেক্ষা করে প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে তারা পড়ছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
সকাল থেকেই সূর্যের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতর অবস্থান করলেও দিনমজুরদের থেমে থাকার সুযোগ নেই। শহরের বিভিন্ন সড়ক, নির্মাণস্থল, বাজার ও গ্রামীণ কৃষিক্ষেত্রে দেখা যায় শ্রমিকরা মাথায় গামছা বেঁধে, কেউবা ছাতা ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মেহেদী হাসান সানী বলেন, প্রতিদিন গরমজনিত অসুস্থতার রোগী বাড়ছে। সেই সঙ্গে ডায়রিয়ার প্রকোপও বাড়ছে। হিটস্ট্রোকের উপসর্গ নিয়েও আসছেন অনেকে। সবাইকে বেশি করে পানি পান, স্যালাইন গ্রহণ এবং রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঝালকাঠি পৌর শহরের কেফাইনগর এলাকার নির্মাণ শ্রমিক মো. সোহেল গোমস্তা বলেন, রোদে দাঁড়ানোই যায় না, শরীর পুড়ে যায়। কাজ করতে করতে মাথা ঘোরে, চোখে ঝাপসা দেখা যায়। তবুও কাজ বন্ধ করি না, তা হলে সংসার চলবে না।
রিকশাচালক মজিবর হাওলাদার বলেন, গরমে মানুষ কম বের হয়, তাই যাত্রী টানতে পাড়ি কম। এ জন্য উপার্জনও কম। আবার এই গরমে রিকশা চালানো খুব কষ্ট। মাঝেমধ্যে মনে হয় আর পারব না, কিন্তু না চালালে আয় নেই। পরিবার নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেতে হলে কষ্টের সীমা দেখা আমাদের মতো লোকের কাজ না।
পৌর শহরের একটি লবণ কারখানায় কাজ করেন নারী শ্রমিক মালা রানী। তিনি বলেন, এই তীব্র গরমে কাজ করা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। গরমে কাজ করতে করতে শরীর একেবারে ক্লান্ত হয়ে যায়। মাথা ঘোরে, মাঝেমধ্যে অসুস্থ লাগে। কিন্তু কাজ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
কৃষক আক্তার হাওলাদার বলেন, এই গরমে মাঠে কাজ করা খুব কঠিন। আমরা খোলা মাঠে রোদে কাজ করি, মাথার ওপর কোনো ছাউনি থাকে না। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিন্তু কাজ থামানো যায় না।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। ঝালকাঠির মতো উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গাছপালা কমে যাওয়া এবং পরিবেশ দূষণ এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সদস্য ও পরিবেশ কর্মী ইসমাঈল মুসাফিরের মতে, দিনমজুরদের এই দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাস্তার পাশে অস্থায়ী বিশ্রামকেন্দ্র স্থাপন, বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, তীব্র গরমের সময় কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ ছাড়া সমাজের বিত্তবান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে পানি ও স্যালাইন বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
/এসএকে