আওয়ামী লীগ সরকার পতনে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর, আদালতের আদেশ নিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে একে একে স্বপদে ফিরতে শুরু করেছেন পলাতক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানরা।
সর্বশেষ বুধবার (৩ জুন) বাগান বাজার ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহাদাত হোসেন সাজু ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কার্যালয়ে আদালতের আদেশের কপি জমা দিয়ে পুনরায় নিজ কার্যালয়ে বসেছেন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মীর মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন ও রাজনৈতিক ‘শেল্টারের’ (আশ্রয়) বিনিময়েই এই আওয়ামী লীগ নেতারা এভাবে পুনর্বাসিত হচ্ছেন। এ নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং দলটির ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে জনরোষের ভয়ে আত্মগোপনে ছিলেন বাগান বাজার ইউপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাজু। তার অনুপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন সেখানে একজন ‘প্রশাসক’ নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম সচল রাখে।
বুধবার পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ শেষে চেয়ারম্যান সাজু বলেন, আমি অপসারিত হইনি। উচ্চ আদালতের আদেশে, ভূজপুর থানা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় আমি কাজে ফিরেছি। মানুষের ভালোবাসায় আমি দায়িত্ব পুনরায় গ্রহণ করেছি এবং সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পরিষদের দাফতরিক কাজ সম্পন্ন করেছি।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, উচ্চ আদালতের আদেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ‘প্রশাসক’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রজ্ঞাপনটি ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ওই চেয়ারম্যান স্বপদে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন।
আওয়ামী লীগ নেতার এমন বীরদর্পে কর্মস্থলে ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ পুরো ফটিকছড়িতে নিন্দার ঝড় ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতার সঙ্গে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে রফা করে এলাকায় ফিরেছেন সাজু।
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বিগত ১৭ বছর যে আওয়ামী লীগ নেতাদের কারণে বিএনপির কর্মীরা নির্যাতিত হয়েছেন, আজ টাকার বিনিময়ে তাদেরই পুনর্বাসন করা হচ্ছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত বা বিতর্কিত সংগঠনের নেতাদের এভাবে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি খোদ বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারাই স্বীকার করেছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জহির আজম চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, এই গর্হিত কাজের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থকড়ি বিনিময় হয়েছে। এমনকি দলের কয়েকজন নেতা তাকে ‘পুনর্বাসনে’ সরাসরি শেল্টার দিচ্ছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, যে বাগান বাজারে গত ১৭ বছর বিএনপির কেউ একটা সভাও করতে পারেনি এবং বহু নেতাকর্মী অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেখানে এভাবে আওয়ামী লীগ নেতাকে পুনর্বাসনে সহায়তা করা চরম আত্মঘাতী ও বিবেকবর্জিত কাজ।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্টের পর ফটিকছড়ি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার মোট ১২ জন চেয়ারম্যান ও দুই মেয়র আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে সরকার তাদের মধ্যে ৬ জনকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তবে উচ্চ আদালতের আইনি ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নিয়ে বাগান বাজার ইউপির সাজুসহ এ পর্যন্ত মোট ৫ জন আওয়ামী লীগ পন্থী চেয়ারম্যান স্বপদে ফিরে এসেছেন।
সময়ের আলো/জোই