মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্না স্বাভাবিক ঘটনা। পরিশ্রম ও আরাম, কষ্ট ও প্রতিদান, অভাব ও প্রাপ্তি সবই যেন হাত ধরাধরি করে চলে জীবনের বাঁকে বাঁকে। সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্না নিয়েই মানুষের জীবন। মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে এমন বৈশিষ্ট্য দিয়ে। বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি মানুষকে বিভিন্ন রকম কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে সৃষ্টি করেছি’ (সুরা বালাদ : ৪)।
এ কারণেই মানুষ সমস্যায় পড়ে, দুঃখ পায়, কষ্ট বয়ে বেড়ায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে মানুষ অভ্যস্ত। তারা বেশ ভালো করেই জানে, এসবই জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু হিসাব কষলে দেখা যায়, অন্যান্য জাতির তুলনায় মুসলমানরাই যেন বেশি দুঃখ-কষ্টে আছেন। ক্ষুধা, দারিদ্র, অসহায়ের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন ‘বিল গেটস’; তিনি হলেন খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। একইভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি চীনের প্রেসিডেন্ট ‘শি জিনপিং’ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন।
ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বীদের মুসলমানদের চেয়েও এই এগিয়ে থাকা এবং তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর বিলাসী জীবনযাপন দেখে অনেকের কপালেই চিন্তার ভাঁজ পড়তেই পারে। তবে কেন মুসলমানরাই এত দুঃখ-কষ্টের জীবনযাপন করছে? অথচ আল্লাহর প্রিয় ধর্ম ইসলাম! আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম। সুতরাং সেই মনোনীত ধর্মের অনুসারী মুসলমানদেরই তো এমন সুখময় বিলাসী জীবন কি মুসলমানদের পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। এমনটা হচ্ছে কেন?
এমন হওয়ার পেছনেও আল্লাহ তায়ালার কিছু মহৎ উদ্দেশ্য আছে। আর তা হলো, মুসলমানদের পরকালীন জীবনকে জান্নাতের সুখে সুষমামণ্ডিত করা। মুসলমানদের কাছে ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীর তেমন কোনো মূল্য নেই। তারা জানে- এই জীবনের শেষে যে জীবনের শুরু, তার সমাপ্তি নেই। সেই অনন্ত জীবনের সুখই তো প্রকৃত সুখ। আর এই সুখময় জীবন পেতে হলে জান্নাতে যেতে হবে।
কিন্তু এই জান্নাতপ্রাপ্তির জন্য মুসলমানদের যতটুকু ইবাদত-সাধনা দরকার, ততটুকু ইবাদত-সাধনা তাদের নেই। থাকলেও তা ভুল-ত্রুটিতে ভরা। তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের সেই ভুল-ত্রুটি মোচনের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রোগ-শোক, দুঃখ-কষ্ট দিয়ে থাকেন। আল্লাহর তায়ালার বাণী, ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে।’ (সুরা বাকারা : ১৫৫)
এই দুঃখ-কষ্টের পরীক্ষা মুসলমানদের জন্য পরম নেয়ামত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানের ওপর যে কষ্ট-ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি তার দেহে যে কাঁটা ফোটে, তার বিনিময়েও আল্লাহ গুনাহ ক্ষমা করে দেন’ (বুখারি : ৫৬৪১)।
এ হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে, রোগ-শোক, দুঃখ-কষ্ট-ক্লেশের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জান্নাত নিশ্চিত করেন। তাই কারও সন্তান মারা গেলে, কারও সম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেলে কিংবা অন্য কোনো বিপদ-আপদে পড়লে এমন কথা না বলা, আল্লাহ আমার সঙ্গেই কেন এমনটি করলেন? অধৈর্য না হয়ে সবুর করতে হবে। মনে ধারণা আনতে হবে আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। হাদিসেও বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যার ভালো চান, তাকেই দুঃখ-কষ্টে ফেলেন।’ (বুখারি : ৫৬৮৪)
মুসলমানদের এত দুঃখ-কষ্ট পাওয়ার আরেকটা উদ্দেশ্য হলো, সতর্ক করা। দুনিয়ার চাকচিক্য, শয়তানের প্ররোচনা এবং লোভ-লালসায় পড়ে মুসলমান যখন পাপের পথে ধাবিত হয়, ভুলে ভরা পথেই চলতে থাকে, তখন তাদের কিছু বিপদ-আপদ, শোক-দুঃখ ও কষ্ট-ক্লেশ দেওয়া হয়। যেন তারা সতর্ক হয়ে যায়। নিজেদের শুধরে নেয়। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করে। সিরাতুল মুস্তাকিমে ফিরে আসে। পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘তারা কি লক্ষ করে না যে, প্রতি বছর তাদের ওপর দুয়েকবার বিপদ আসছে? এরপরও তারা তওবা করে না। উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না?’ (সুরা তওবা : ১২৬)
এই দুনিয়াবি জীবনে অমুসলিমরা মুসলমানদের চেয়ে অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতায় এগিয়ে থাকার পেছনেও একটা সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। আর তা হলো তাদের ভালো কাজের বিনিময় বুঝিয়ে দেওয়া। অমুসলিমরাও অনেক সময় দুস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা করে, রোগীর সেবা-শুশ্রুষা করে, রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদি জনসেবামূলক কাজ করে থাকে। নিঃসন্দেহে এগুলো ভালো কাজ। তাদের এই ভালো কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার জীবনকে ভোগ-বিলাসে ভরিয়ে দেন। দুনিয়াকে তাদের কাছে জান্নাত বানিয়ে দেন। যদিও প্রকৃত জান্নাতের কাছে এই দুনিয়ার চাকচিক্য কিছুই না।
অমুসলিমদের এই সুখ, ঐশ্বর্য দেখে মুসলমানদের আফসোস করার কিছুই নেই। মুসলমানদের কাছে জান্নাতের তুলনায় এই ক্ষণস্থায়ী সুখ মূল্যহীন। এই পৃথিবীর চেয়ে দশগুণ বড় জান্নাত তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই জান্নাতি সুখের জন্যই তারা সব দুঃখ, কষ্ট-ক্লেশ হাসিমনে বরণ করে নেয়। প্রকৃত মুসলমান তো তিনিই, যিনি বিপদ এলে, বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করেন। নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। কারণ তিনি জানেন, ‘সেই সফল হয়েছে, যে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সুরা শামস : ১০)
সময়ের আলো/আআ