বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন দীঘির একমাত্র কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম। সাড়ে ৫০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু টিকিয়ে রাখতে অনতিবিলম্বে কুমিরটি দীঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একই সাথে মাজার, দীঘি ও এর আশপাশের জমি তাদের বংশানুক্রমিক সম্পদ বলেও দাবি করেন ওই খাদেম।
এর আগে গত ১ জুন দীঘির কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সেটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার (৩ জুন) দুপুরে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বন বিভাগ কুমিরটি ধরে নিয়ে যায়। বর্তমানে প্রাণীটি খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে বন বিভাগের কড়া তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
কুমির সরিয়ে নেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মাজারের প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘খান জাহান আলীর মাজার এবং এই দীঘি সাড়ে পাঁচশত বছর ধরে আমাদের পরিবার যত্নে দেখভাল করে আসছে। আমাদের হয়তো কিছু ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু এই কুমির বাগেরহাটের সাধারণ মানুষের সম্পদ ও ইতিহাস। দুর্ঘটনা পৃথিবীর যেকোনো স্থানেই ঘটতে পারে, তাই বলে এক রাতের সিদ্ধান্তে ঐতিহ্যবাহী কুমিরটিকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। আমরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
জেলা প্রশাসকের রাতের জরুরি বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘থানায় বা আদালতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড ঘটলে কি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়? অথচ একটি মেয়ে মারা যাওয়ার পর জেলা প্রশাসক রাত ৯টায় জরুরি বৈঠক ডেকে কুমির সরানোর একতরফা সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি সে সময় খুলনায় থাকায় বৈঠকে থাকতে পারিনি। পরদিন সকালেই পুলিশ এনে কুমিরটি ধরে নিয়ে যাওয়া হলো, যা মোটেও ভালো কাজ হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে নিরাপত্তার জন্য ৮ জন পাহারাদার রেখেছি। এখন কুমির ফিরিয়ে আনা হলে প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আরও সুদৃঢ় নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা হবে।’
মাজারে ঘুরতে আসা শেখ বাদশা নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘কুমির ছাড়া খানজাহান আলীর দীঘির ঐতিহ্য ভাবাই যায় না। তবে এখানে কুমির সংরক্ষণের পদ্ধতি সঠিক নয়। মানত করা হাঁস-মুরগি দীঘির পানিতে ভিজিয়ে আবার নিয়ে যাওয়া হয়, কুমির ঠিকমতো খাবার পায় কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।" খুলনা থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "কুমির না থাকলে দীঘিটি হয়তো প্রভাবশালীরা মাছ চাষের নামে গ্রাস করে নেবে। সরকারের উচিত পুরো মাজারের দায়িত্ব নিয়ে রাজস্ব বাড়ানো এবং কুমিরের সুরক্ষায় নিরাপদ বেষ্টনী তৈরি করা।’
তবে সুরক্ষার স্বার্থে কুমির সরানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়দের একাংশ। মাজারের পাশের বাসিন্দা কুলসুম বেগম বলেন, ‘খানজাহান আমলের পুরোনো কুমিরগুলো শান্ত ছিল, কিন্তু বর্তমানের এই কুমিরটি অনেক হিংস্র। এর ভয়ে আমরা দীঘির পানিতে নামতেই পারতাম না।’ মোল্লাহাট থেকে পরিবার নিয়ে আসা শাহিদা বেগমও সাময়িকভাবে কুমির সরানোকে সমর্থন করে উপযুক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পর পুনরায় তা উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, দীঘিটি বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ না থাকলে এবং প্রশাসন কঠোর হলে এই দীঘির এক প্রান্তে মিষ্টি পানির কুমিরের জন্য একটি আধুনিক প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।
কুমিরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে জানিয়ে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘মিঠা পানির এই কুমিরকে সুন্দরবনের নোনা পানিতে ছাড়লে এটি বাঁচবে না। আমরা চেষ্টা করছি প্রাণীটি যে পরিবেশে অভ্যস্ত, সেখানেই তাকে অবমুক্ত করতে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/জেডি