আর ছয় দিন পর পেশ করা হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আসন্ন বাজেটে সরকার ১০টি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এগুলো হলো- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক খাত সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা। এসব খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দও রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এ ১০ খাতের পাশাপাশি নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও গুরুত্ব পাবে।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরাসরি ‘সম্পদ কর’ চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে নতুন কর ব্যবস্থার পরিবর্তে বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। এনবিআরের এ সিদ্ধান্তে সরকার বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।
এবারের বাজেটে আয়কর খাতে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ন্যূনতম কর ও উৎসে করের মধ্যে যৌক্তিক সমন্বয় আনা হবে। পাশাপাশি করদাতাদের স্বস্তি দিতে চালু হচ্ছে ‘অটোমেটিক রিফান্ড’ বা স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা। ফলে কোনো করদাতা ভুলবশত বা নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত কর জমা দিলে বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই তিন মাসের মধ্যে সেই অর্থ ফেরত পাবেন।
অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলো এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন : আগামী বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া ১০ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ শীর্ষে থাকবে। পাশাপাশি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। যুবকদের এসএমই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ১০ হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিম রাখা হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা : এ খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকবে। একই সঙ্গে নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা : আগামী বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সার খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রাখা হতে পারে। পাশাপাশি কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ভর্তুকি প্রদান এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি : দেশে বেকারত্ব কমানো এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শক্তিশালী করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হতে পারে। পাশাপাশি নতুন ব্যবসা ও চাকরি সৃষ্টির লক্ষ্যে ঋণের শর্ত সহজ করা হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা : নতুন বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুতে ৩৭ হাজার কোটি, গ্যাসে ৬ হাজার ৫০ কোটি এবং সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিপণ্যকে ‘অগ্রাধিকার শিল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাতে কর ছাড়, সহজ ঋণ এবং রফতানিতে বিদ্যমান বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগ : এ খাতেও বরাদ্দ বাড়তে পারে। লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে। জাতীয় মহাসড়কগুলোকে ‘ট্রেডমার্ক’ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল হাইওয়েতে বড় বরাদ্দ থাকবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা : বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন রোধ এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হবে।
রাজস্ব সংস্কার ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা : কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেবে সরকার। পাঁচ বছরের ট্যাক্স ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন, কর ফাঁকি ও কর এড়ানো রোধ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য আগামী ১১ জুন যে বাজেট পেশ করা হবে তার আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এতে ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট।
এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যার ১৬.৭ শতাংশ যাবে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতের চাপ কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে।
‘সম্পদ কর’ থেকে সরে আসছে এনবিআর : এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরাসরি ‘সম্পদ কর’ চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাবিত এই নতুন নিয়মে সম্পদের ন্যূনতম করমুক্ত সীমা আগের মতোই ৪ কোটি টাকা রাখার কথা বলা হয়েছিল, তবে কর গণনার পদ্ধতিতে আনা হয়েছিল আমূল পরিবর্তন।
আগে করদাতারা তাদের ‘আয়করের ওপর ভিত্তি করে’ সারচার্জ পরিশোধ করতেন; কিন্তু নতুন খসড়া অনুযায়ী কর দিতে হতো সরাসরি ‘মোট সম্পদের মূল্যের ওপর’। এই খসড়ায় ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদকে করছাড় দিয়ে ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর ০.৫০ শতাংশ কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়লে করের হারও ধাপে ধাপে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছিল। খসড়া অনুযায়ী ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের জন্য ১ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের জন্য দেড় শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে মোট সম্পদমূল্যের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সরাসরি সম্পদ কর হিসেবে দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছিল। আগে করদাতারা দলিলের পুরোনো মূল্য দেখিয়ে পার পেয়ে যেতেন। নতুন নিয়মে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারিত হতো বর্তমান বাজারমূল্য বা সরকারি নির্ধারিত সর্বশেষ মৌজা মূল্য অনুযায়ী।
ধনীদের সম্পদের ওপর আরোপিত বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা থেকে সরকার বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে দেশে বর্তমানে ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদ রয়েছে এবং সারচার্জের আওতায় এসেছেন এমন নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা ৩০ হাজার ৮০৪ জন। এই ধনী করদাতারা তাদের আয়কর রিটার্নে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার সম্পদ ঘোষণা করেছেন।
এই বিশাল পরিমাণ সম্পদের বিপরীতে বছরে মোট সারচার্জ আদায় হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এটি মোট ঘোষিত সম্পদের মাত্র ০.২৯ শতাংশ। তবে সারচার্জ ব্যবস্থা বাতিল করে সরাসরি সম্পদ কর করা হলে অন্তত ২-৩ লাখ করদাতা থেকে বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা আয়কর আদায় হতো বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।