ভারতের রাজধানী দিল্লির মালব্য নগরের ‘ফ্লুরিশ স্টে বিএনবি’ হোটেলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২ জন বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ২১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) সকালে লাগা এই অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এবং আগুনে পুড়ে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উদ্ধারকাজের সময় একটি বাথরুম থেকে পরস্পরকে শেষ আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় এক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা উদ্ধারকারীদেরও গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) ভারতের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে দিল্লি পুলিশের বরাত দিয়ে এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছ।
দমকল ও স্থানীয় উদ্ধারকারীদের সূত্রে জানা গেছে, হোটেলের একটি বাথরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে এক নারী ও এক পুরুষকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে কমোডের ওপর বসা নারীকে পাশের একটি চেয়ারে বসা তার পুরুষ সঙ্গী অত্যন্ত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ শোয়েব জানান, বাথরুমের ভেতরে আটকা পড়া এই দম্পতি আগুনে পুড়ে নয়, বরং দরজা বন্ধ থাকায় ভেতরে ঢুকে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গেছেন। অন্য একটি কক্ষের বিছানার কোণ থেকে সম্পূর্ণ ঝলসে যাওয়া আরেক দম্পতির নিথর দেহ এবং হোটেলের বেসমেন্টের রিসেপশনের কাছ থেকে বছর পঁচিশের এক তরুণী ও তার পাশে হুইলচেয়ারে বসা এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির দগ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।
হোটেলের এই চরম বিপদের মুহূর্তে দমকলের ১৭টি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই নিজেদের জীবন বাজি রেখে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন শোয়েব, আফজল, ওয়াসিম ও আশরাফ খানের মতো স্থানীয় একঝাঁক তরুণ। কোনো ধরনের সুরক্ষাকবচ ছাড়াই ঘন ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া ভবনের ভেতরে ঢুকে বিছানার চাদরে জড়িয়ে তারা অবরুদ্ধ মানুষদের নিচে নামিয়ে আনেন।
অন্যদিকে পাঁচ তলার ছাদ থেকে বাঁচার জন্য আকুতি জানানো মানুষদের নিচে লাফ দিতে উৎসাহিত করতে রাস্তার ওপর নিজের দোকান থেকে ২০-২২টি তোষক এনে বিছিয়ে দেন রিয়াজুদ্দিন মনসুরি ও তার ছেলে আরমান। এতে নিজের প্রায় ২ লাখ টাকার তোষক নষ্ট হলেও মানবতার খাতিরে অনেকের মূল্যবান প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন বলে জানান রিয়াজুদ্দিন।
দিল্লি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনের শর্ট সার্কিট থেকেই মূলত এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। তবে এই বিপুল পরিমাণ মৃত্যুর পেছনে হোটেল কর্তৃপক্ষের চরম ও অপরাধমূলক গাফিলতি দায়ী বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলটির কোনো বৈধ ‘ফায়ার এনওসি’ বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছিল না এবং মাত্র ৬টি কক্ষ চালানোর অনুমতি থাকলেও বেআইনিভাবে সেখানে ২৫টি কক্ষ পরিচালনা করা হচ্ছিল। বহুতল ভবনটিতে জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার জন্য কোনো ‘ইমার্জেন্সি এক্সিট’ ছিল না এবং ওঠানামার একমাত্র সিঁড়িটি একদম মাঝখানে থাকায় তা দ্রুত বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এ ছাড়া জানালাগুলো স্থায়ীভাবে সিল করা ছিল এবং প্রধান দরজাটি সেন্সর-চালিত হওয়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই তা পুরোপুরি লক হয়ে যায়।
দুর্ঘটনার সময় ভোরের দিকে অধিকাংশ অতিথিই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, যার ফলে তারা দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ পাননি। উদ্ধারকারীরা ধোঁয়ায় অচেতন অবস্থায় ৫৮ জনকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করেছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
ঘটনার পরপরই নিজের গাড়ি নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান হোটেলের মালিক লভকেশ বাজাজ। তবে বুধবার রাতেই দিল্লি পুলিশ তাকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনাটি দিল্লির আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম কঙ্কালসার ও বিপজ্জনক রূপটি আবারও পুরো দেশের সামনে উন্মোচিত করল।
সূত্র: এনডিটিভি
সময়ের আলো/টিএইচ