আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে কোনো দুর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকারের পতন- ইতিহাসের পাতায় এমন দৃষ্টান্ত বিরল। কারণ, ক্ষমতার পতন কোনো একক আইনি ধারা বা বিচারিক রায়ে ঘটে না; তা ঘটে তখনই যখন শাসনের নৈতিক বৈধতা ধসে পড়ে, জনগণের আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করে এবং শাসকগোষ্ঠী চারপাশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অহমিকাকে বড় করে দেখে।
তবে ইতিহাসের কিছু সন্ধিক্ষণে একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা অসন্তোষ, বঞ্চনা ও ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তখন সেই রায় আর কেবল একটি আইনি দস্তাবেজ থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের দৃশ্যমান সূচনা।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের কোটা-সংক্রান্ত রায় ছিল তেমনই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। রায়টি নিজে কোনো সরকারের পতন ঘটায়নি; কিন্তু এটি এমন এক রাজনৈতিক বিস্ফোরণের সূচনা করে, যা ধীরে ধীরে একটি প্রশাসনিক বিতর্কের সীমা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অভিঘাতে রূপ নেয়। সেই অভিঘাতের ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় এক অগ্নিগর্ভ গণজাগরণ, যা অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের দীর্ঘ দেড় দশকের নিশ্ছিদ্র শাসনব্যবস্থাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা লিখেছিলেন, কোনো শাসনব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন সে নিজেকে সবচেয়ে স্থিতিশীল বলে মনে করে। ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের অবস্থাও ছিল অনেকটা তেমনই। তাদের কাছে কোটা প্রশ্ন ছিল একটি প্রশাসনিক বিষয়; কিন্তু বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে তা ক্রমশ রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ, সমঅধিকার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নে রূপ নেয়। ফলে ৫ জুনের রায় তার আইনি সীমানা অতিক্রম করে একটি রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়, যার চূড়ান্ত অভিঘাত প্রকাশ পায় ৫ আগস্টের ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে সরকার দীর্ঘদিনের প্রচলিত কোটাব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ আবেদনকারীরা সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। রায় ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়।
এই আন্দোলন পরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে সংগঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে তা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। শুরুর দিকে আন্দোলনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগকেন্দ্রিক হলেও দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। প্রথমদিকে ক্ষমতাসীনরা এটিকে একটি সীমিত ছাত্র-অসন্তোষ হিসেবে দেখেছিল।
কিন্তু তারা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে, এটি কেবল কোটা প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ, সুযোগের সমতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্য- ‘আমাদের কেউ ভাবেনি এই সহিংস আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাতের দিকে গড়াবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল এই বিশ্বাস করা যে রাষ্ট্রীয় শক্তি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিকল্প হতে পারে। তারা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা শুনতে ব্যর্থ হয়; উল্টো তাকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি এক সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করে। ফলে সংলাপের পরিবর্তে দমন, যুক্তির পরিবর্তে লাঠি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন প্রাধান্য পায়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলা ছিল সেই রাজনৈতিক ব্যর্থতার দৃশ্যমান পরিণতি।
এরপর আন্দোলনের চরিত্র পরিবর্তিত হয়। শিক্ষার্থীরা আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা রাষ্ট্রীয় আচরণের নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো- যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতিবাদকারীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সে নিজের বৈধতার ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলে।
বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের ওপর গুলি চালানোর দৃশ্য ছিল জুলাই আন্দোলনের একটি নির্ধারক নৈতিক মুহূর্ত। নিরস্ত্র আবু সাঈদকে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়- ভয়কে অতিক্রম করে রাষ্ট্রীয় শক্তির মুখোমুখি এক অবিচল নাগরিক হিসেবে। সেই দৃশ্য কেবল একটি মৃত্যুর দৃশ্য ছিল না; তা ছিল রাষ্ট্রকে
উদ্দেশ্য করে এক নীরব প্রশ্ন : জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কতদূর যেতে পারে? এই দৃশ্য বাংলাদেশের মানুষের সমষ্টিগত বিবেককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। এটি আর একটি ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের নৈতিক সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়।
ইতিহাসে কিছু দৃশ্য থাকে, যা একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনায় স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। ভিয়েতনামের ন্যাপাম হামলার ছবি, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর দৃশ্য কিংবা আরব বসন্তে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের চিত্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল, কারণ সেগুলো একটি বৃহত্তর নৈতিক সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যও তেমনই এক ঐতিহাসিক প্রতীকে রূপ নেয়। নিরস্ত্র এক তরুণের সেই অবিচল অবস্থান লাখ মানুষের কাছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের সংকটকে এক মুহূর্তে দৃশ্যমান করে তোলে। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন একজন মানুষ; কিন্তু জাতির স্মৃতিতে অমর হয়ে যায় একটি দৃশ্য। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল একজন তরুণ; কিন্তু আহত হয়েছিল রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা।
১৮ জুলাই সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয় এবং ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। পরদিন ১৯ জুলাই কারফিউ জারি করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ২৩ জুলাই সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে কোটাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনে।
কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে গেছে। বহু প্রাণহানি, নির্বিচার গ্রেফতার, নিপীড়ন এবং বিচারহীনতার অভিযোগ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুকে কোটার প্রশ্ন থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে নিয়ে যায়। ফলে সরকারের ছাড় আন্দোলনকে থামাতে পারেনি।
এই সময় হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু দমন-পীড়নের মাত্রা যত বেড়েছে, আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিও তত বিস্তৃত হয়েছে। ২ আগস্ট কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত হত্যা ও দেশব্যাপী নিপীড়নের প্রতিবাদে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সামনে বিক্ষুব্ধ কবি-লেখক সমাজ প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্ত, যখন আন্দোলন শিক্ষাঙ্গনের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সমর্থন লাভ করতে শুরু করে।
৩ আগস্ট আন্দোলনকারীরা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে এবং সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। ৪ আগস্ট সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী লংমার্চের ঘোষণা আসে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ ও রক্তপাত ঘটে। অবশেষে ৫ আগস্ট হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। গণভবন জনতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।
৫ আগস্টের ঘটনাটি কোনো এক দিনের আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বৈধতার সংকট, রাজনৈতিক অন্ধত্ব এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক প্রতিক্রিয়ার সম্মিলিত পরিণতি। ৫ জুনের রায় সেই সংকটকে দৃশ্যমান করেছিল; জুলাইয়ের রক্তপাত তাকে গভীরতর করেছিল; আর ৫ আগস্ট ছিল তার অনিবার্য রাজনৈতিক পরিণতি।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে- যখন জনগণের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা প্রত্যাখ্যান করে, তখন কেবল প্রশাসনিক শক্তি বা দমনমূলক ব্যবস্থা দিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রের নল থেকে নয়; তা উৎসারিত হয় নাগরিকদের সম্মতি ও আস্থা থেকে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রের বৈধতাকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বৈধতা ক্ষয় হতে শুরু করলে রাষ্ট্রের হাতে বলপ্রয়োগের সামর্থ্য থাকলেও তার নৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। সরকার যতই কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, জনগণের একাংশের মধ্যে ততই এই ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে রাষ্ট্র তাদের কথা শুনতে নয়, তাদের নীরব করতে চায়। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই সংকটটি আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন থেকে বৈধতার প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধু একটি সরকারের পতনের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্র, বৈধতা এবং নাগরিক মর্যাদার সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক পাঠ। ৫ জুনের রায় সেই সংকটকে দৃশ্যমান করেছিল, আর ৫ আগস্ট ছিল তার রাজনৈতিক পরিণতি। যে সংকট দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জমে ছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে বিস্ফোরিত হয়।
এই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র কেবল সংবিধান, আইন বা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা ও নৈতিক সম্মতি। যখন সেই আস্থা ক্ষয় হতে শুরু করে,
তখন সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাও অপ্রত্যাশিতভাবে ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।
৫ জুন থেকে ৫ আগস্টের যাত্রাপথ তাই কেবল একটি আদালতের রায় থেকে সরকারের পতনের সরল ইতিহাস নয়; বরং এটি বৈধতা হারানো ক্ষমতার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত গণক্ষোভের এমন এক বিস্ফোরণ, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
লেখক : গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক