কিছু মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিবাস্বপ্নে ডুবে থাকেন। কেউ কেউ আবার একটি কল্পিত গল্পকেই দশকের পর দশক ধরে নিজের মনে বাঁচিয়ে রাখেন। আর এই অভিজ্ঞতা তাদের জন্য ভীষণ কষ্টদায়ক হয়ে উঠতে পারে। আপনার দিবাস্বপ্ন দেখা কখন স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে সমস্যায় পরিণত হচ্ছে, তা কীভাবে বুঝবেন?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক কলিন রসের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি তাকে বলি, আমার দিবাস্বপ্নগুলো এতটাই জীবন্ত ও নিমগ্নতাপূর্ণ যে, আমি চাইলে নিজেকে কাঁদাতে বা উচ্চস্বরে হাসাতেও পারি। আমি আরও বলি, ইচ্ছামতো আমি এসব কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারি এবং আমি তা উপভোগও করি। তিনি আমার এই ক্ষমতাকে একটি ‘অ্যাথলেটিক গিফট’ বা বিশেষ দক্ষতা হিসেবে আখ্যা দেন এবং অভিনয়ে ক্যারিয়ার গড়ার কথা বিবেচনা করতে পরামর্শ দেন। আমি সে বিষয়ে খুব একটা নিশ্চিত নই, তবে প্রশংসাটি সানন্দে গ্রহণ করি।
কিন্তু যদি আপনি এই অন্তর্গত সিনেমা থেকে ইচ্ছামতো বেরিয়ে আসতে না পারেন? সেখানেই সমস্যার শুরু। এমন অবস্থার নাম ‘ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং’। এ অবস্থায় মানুষ তার জেগে থাকা সময়ের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ব্যয় করে মনে মনে জটিল, বিস্তৃত ও সূক্ষ্ম বিবরণসমৃদ্ধ কল্পনার জগৎ নির্মাণে। সেখানে থাকে গল্প, চরিত্র এবং দীর্ঘ বর্ণনামূলক কাহিনী। রসের ভাষায়, চরম ক্ষেত্রে কেউ কেউ দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত দিবাস্বপ্নে ডুবে থাকতে পারেন। তাদের কল্পনার গল্পের প্লট কখনো কখনো টানা কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে।
আরও পড়ুন
শুনতে বিষয়টি হয়তো বিস্ময়কর, এমনকি সৃজনশীল ও অনুপ্রেরণাদায়কও মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এসব মানুষ তাদের অন্তর্জগতের মধ্যে এতটাই নিমগ্ন হয়ে পড়েন যে, তা দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং গভীর মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এটি যতটা বিরল বলে মনে হতে পারে, বাস্তবে ততটা নয়। রসের মতে, সম্ভবত প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ২ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত। তা হলে কীভাবে বুঝবেন, আপনার দিবাস্বপ্ন দেখা একটি সমস্যায় পরিণত হচ্ছে? আর এর চিকিৎসাই বা কী?
জেগে আছি, তবু স্বপ্ন দেখছি প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- দিবাস্বপ্ন দেখা নিজে থেকে কোনো খারাপ বিষয় নয় বরং ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। কলিন রস বলেন, আপনি যদি একেবারেই দিবাস্বপ্ন না দেখেন, তা হলে আপনার জন্য আমার খারাপই লাগবে।
দিবাস্বপ্নকে সাধারণত মানুষের একটি স্বাভাবিক মানসিক কার্যকলাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা প্রায় সবাই কোনো না কোনো মাত্রায় অভিজ্ঞতা করেন। গবেষকেরা স্ব-প্রতিবেদনভিত্তিক প্রশ্নমালার মাধ্যমে অনুমান করেছেন যে, আমরা জেগে থাকা অবস্থায় আমাদের মানসিক কার্যকলাপের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সময় এমন চিন্তায় ব্যয় করি, যা সেই মুহূর্তে আমরা যে কাজটি করছি তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
দিবাস্বপ্ন শুধু আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতেই সহায়তা করে না; এটি একঘেয়েমি দূর করতেও সাহায্য করে এবং জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে অর্থ খুঁজে পেতেও মানুষকে সহায়তা করে।
কিন্তু ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং বা সমস্যাজনক দিবাস্বপ্নের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। কলিন রসের ভাষায়, এটি মানুষকে ‘সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে ফেলতে পারে’। তিনি বলেন, এটি মানসিক কষ্টের সৃষ্টি করে এবং স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন ও কাজ করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে... তবুও মানুষ এটি করে যেতে থাকে, কারণ এর মধ্যে এক ধরনের বাধ্যতামূলক বা নেশাসদৃশ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
আর এ কারণেই এটিকে ‘ম্যালঅ্যাডাপটিভ’ বা ক্ষতিকর মানসিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দিবাস্বপ্নের দীর্ঘ পর্ব থেকে যখন আক্রান্ত ব্যক্তি অবশেষে বাস্তবে ফিরে আসেন, তখন তারা প্রায়ই তাদের সেই কল্পনার জগৎ অর্থহীন, নিষ্ফল এবং সময়ের অপচয় বলে মনে করেন। কিন্তু এর আসক্তিকর প্রকৃতির কারণে সেই চক্র আবারও শুরু হয়। এটি এমন এক অভ্যাস, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।
কাইলা বোরচার্ডসের অভিজ্ঞতার কথাই ধরা যাক। তিনি মনে করতে পারেন, মাত্র চার বছর বয়স থেকেই তিনি নিজের মনে ‘অন্য জগৎ’ তৈরি করতেন। পরে যখন তিনি নতুন একটি স্কুলে ভর্তি হন এবং সহপাঠীরা তার আঞ্চলিক উচ্চারণ নিয়ে উপহাস করতে শুরু করে, তখন এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেই কল্পনার গল্পগুলোই তার কাছে এক ধরনের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হয়ে দাঁড়ায় একটি জগৎ, যেখানে ‘কেউ আমাকে বিদ্রুপ করত না, সবাই আমাকে পছন্দ করত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোরচার্ডসের দিবাস্বপ্ন দেখা একটি বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হয়, যা একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত। তিনি বলেন, এটি ছিল এক ধরনের প্রবল তাড়না। যেমন মানুষ বলে, তাদের হঠাৎ প্রচুর চকোলেট খাওয়ার ইচ্ছা হয়, বা বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢোকার তাগিদ অনুভব কওে এটাও তেমনই ছিল।
এখানেই একটি স্বাভাবিক ও উপকারী আচরণ ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ইসরাইলের হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক এলি সমির বলেন, সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ আর নিজের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বরং কল্পনাই মানুষটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
‘ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং’ শব্দবন্ধটির প্রবর্তকও সোমার। তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে আসছেন।
ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং বা সমস্যাজনক দিবাস্বপ্ন সাধারণত সংগীত শোনা কিংবা একই ধরনের শারীরিক কাজ বারবার করার মাধ্যমে টিকে থাকে এবং আরও শক্তিশালী হয়। যেমন- একটানা পায়চারি করা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি দিবাস্বপ্নে নিমগ্ন অবস্থায় মনোযোগ ধরে রাখার জন্য অচেতনভাবেই বিভিন্ন শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা নড়াচড়া করেন।
কাইলা বোরচার্ডসের ক্ষেত্রে এর প্রকাশ ছিল ভিন্ন। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোলার-স্কেট পরে নিজের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে এদিক-ওদিক হাঁটতেন, অথবা দেয়ালে বল ছুড়ে আবার ধরতেন। এসব কাজ করতে করতেই তিনি নিজের কল্পনার জগতে ডুবে থাকতেন।
দিবাস্বপ্নে এত বেশি সময় ব্যয় করার কারণে ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিংয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক অনুষ্ঠান, বন্ধুত্ব কিংবা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর ফলে আবার লজ্জা, অপরাধবোধ ও আক্ষেপের এক দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যা তাদের অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।
বোরচার্ডস প্রথম বুঝতে পারেন যে তার দিবাস্বপ্ন দেখা একটি সমস্যা হয়ে উঠছে, যখন তিনি কর্মজীবনের শুরুর দিকে ছিলেন। তিনি বলেন, আমার কোনো প্রেরণাই ছিল না। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য আমি কেন এত সময় ও শক্তি ব্যয় করব, যখন কোনো পরিশ্রম ছাড়াই আমি এই মুহূর্তে আমার কল্পনায় সেই সাফল্য পেতে পারি আর সেটি বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রায় ৯৫ শতাংশের মতোই সন্তোষজনক?
তিনি আরও বলেন, আমি চল্লিশের কোঠায় পৌঁছেও একই ধরনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ করছিলাম, কারণ আমি কখনও পদোন্নতির জন্য চেষ্টা করিনি। বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে খুবই বোধগম্য।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিংয়ের গবেষণা পরিচালক এবং একজন ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী, ওয়ান্ডা ফিশেরা বলেন, ভাবুন তো, আপনার সবচেয়ে প্রিয় টেলিভিশন সিরিজটি, কিন্তু সেখানে নায়ক বা নায়িকা আপনি নিজেই। যদি আপনার বর্তমান জীবন ততটা রোমাঞ্চকর না হয়, তা হলে সেই কল্পনার জগৎ ছেড়ে দেওয়া কতটা কঠিন হতে পারে?
যখন কোনো মানুষের গুরুত্বপূর্ণ আবেগগত চাহিদা অপূর্ণ থেকে যায়, তখন ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং সেই শূন্যতা পূরণের এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে। কল্পনার জগতে তারা অনুভব করতে পারেন যে তাদের সেই চাহিদাগুলো পূরণ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিংয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত নিজেদের দিবাস্বপ্নের ভেতর খুব জীবন্তভাবে উপস্থিত অনুভব করেন এবং সেখানে তারা প্রায়ই ভালোবাসার পাত্র, সম্মানিত ব্যক্তি কিংবা বীরের ভূমিকায় থাকেন।
মারিয়া (যিনি নিজের পদবি প্রকাশ করতে চাননি) প্রায়ই কল্পনা করতেন যে তিনি একটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন, অসংখ্য মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি সফল, পরিচিত এবং সবার স্বীকৃতি পাচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানী ওয়ান্ডা ফিশেরা, এ ধরনের কল্পনা হয়তো এই কারণে তৈরি হয় যে, এমডিতে আক্রান্ত অনেক মানুষের মনে এক ধরনের গভীর লজ্জাবোধ বা আত্মসন্দেহ কাজ করে। তারা মনে করতে পারেন, হয়তো আমি যেমন, তেমন অবস্থায় যথেষ্ট ভালো নই, মানুষ আমাকে আমার প্রকৃত সত্তার জন্য ভালোবাসে না কিংবা আমি আমার আসল নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না।