মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

মীযান মুহাম্মদ হাসান

ইসলাম

পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং মধুর শব্দ ‘মা’। এই শব্দের কোনো তুলনা নেই, কোনো পরিমাপ নেই। মা মানেই মমতা, মা মানেই

2026-06-06T04:29:55+00:00
2026-06-06T04:29:55+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
মীযান মুহাম্মদ হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ৪:২৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং মধুর শব্দ ‘মা’। এই শব্দের কোনো তুলনা নেই, কোনো পরিমাপ নেই। মা মানেই মমতা, মা মানেই এক অপার আশ্রয়ের ছায়া। বিশ্বের সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও ভৌগোলিক সীমারেখায় মায়ের সম্মান ও মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। এটি কেবল একটি আবেগ নয়, বরং প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম। যার মা নেই, সে বোঝে পৃথিবীর সবকিছু থেকেও কতটুকু শূন্যতা তার জীবনে রয়ে গেছে। আর যার মা জীবিত, তিনি হয়তো প্রতিনিয়ত সেই পরম স্নেহের পরশ পাচ্ছেন, যা মা হারানোর বেদনার তুলনায় অনেক বেশি আশীর্বাদস্বরূপ। মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কোনো প্রতিদান কি আদৌ দেওয়া সম্ভব?

একজন মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন দীর্ঘ দশ মাস দশ দিন। সেই গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবকালীন যন্ত্রণা এবং এরপর তিলে তিলে সন্তানকে বড় করে তোলার যে অমানুষিক শ্রম, তা কোনো পার্থিব সম্পদ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ঝলমলে এই পৃথিবীর আলো-বাতাস সন্তান যেন নির্বিঘ্নে দেখতে পায়, তার জন্য মা নিজের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দেন। শৈশব থেকে কৈশোর, এমনকি যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত মা-ই সন্তানের ছায়ার মতো পাশে থাকেন। মায়ের পাশাপাশি পরম শ্রদ্ধার পাত্র হলেন বাবা। একজন বাবা সন্তানের সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য নিজের সুখ-শান্তি, সময় এবং উপার্জিত অর্থ নির্দ্বিধায় ব্যয় করেন। পড়াশোনা ও শিক্ষা-দীক্ষা প্রদানের মাধ্যমে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে একজন আদর্শ বাবার অবদান কোনো অংশেই কম নয়। হাদিসে এসেছে, সন্তানকে সুন্দর চরিত্র ও আদর্শ শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়াই একজন বাবার পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ দান। মা-বাবা উভয়েই সন্তানের জীবনের পরম আরাধ্য।
আরও পড়ুন

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আনকাবুতের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমি মানুষকে আদেশ করেছি, যেন সে তার মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করে।’ এ ছাড়া সুরা বনি ইসরাইলের ২৩-২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত জোরালোভাবে মা-বাবার মর্যাদা তুলে ধরেছেন, ‘আপনার প্রতিপালক আদেশ করছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া আর কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। যদি তাদের মধ্য হতে কোনো একজন অথবা উভয়ই বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তবে তুমি তাদের জন্য উহ শব্দও বলো না। তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সঙ্গে নম্রতার সঙ্গে কথা বলো। তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণ করো এবং বিনয়াবনত থেকো।’ এখানে বিশেষভাবে দোয়া করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, আপনিও তাদের প্রতি তেমনি রহমতের আচরণ করুন।’

হাদিসের ভান্ডারেও মা-বাবার মর্যাদা অপরিসীম। সহিহ বুখারির ৫৯৭১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছ থেকে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, ‘তোমার মা।’ ব্যক্তিটি আবারও জিগ্যেস করলেন, ‘অতঃপর কে?’ তিনি আবারও বললেন, ‘তোমার মা।’

তৃতীয়বার জিগ্যেস করার পরও তিনি একই উত্তর দিলেন। চতুর্থবার জিগ্যেস করলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, মায়ের মর্যাদা ইসলামের দৃষ্টিতে কত উঁচুতে।

পবিত্র হাদিস থেকে আরও জানা যায়, সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের পর মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। এটি কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং এটিই সফলতার আসল পথ। যে ব্যক্তি নিজের মা-বাবাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে, সে স্বয়ং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পথ প্রশস্ত করে নিয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মা-বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মা-বাবার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (সুনানে তিরমিজি : ১৮৯৯)

অথচ বড় দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো, আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আজ মানুষ তার শেকড় ভুলে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে অনেকে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পাশাপাশি নিজের মা-বাবার সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করছে। তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা তো দূরের কথা, অবহেলা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মাধ্যমে তাদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকে। আজ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো বা তাদের খোঁজ না নেওয়াটা যেন এক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তাদের ত্যাগ আর আত্মবিসর্জন না থাকলে আজ আমরা পৃথিবীর আলো দেখতে পেতাম না। যে মা-বাবা আমাদের জন্য নিজের জীবন উজাড় করে দিলেন, তাদের প্রতি আমরা কেন আজ এত নির্দয় হচ্ছি? আমাদের মনুষ্যত্ব কি এতটাই মরে গেছে? নৈতিকতার এই চরম অবক্ষয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মা-বাবার প্রতি প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য হলো তাদের বৃদ্ধ বয়সে সেবা-যত্ন করা, সুন্দর ও নম্র ভাষায় কথা বলা এবং তাদের মনে কোনো কষ্ট না দেওয়া। তাদের দোয়াই পারে আমাদের ইহকাল ও পরকাল সুন্দর করতে। আসুন, আমরা শপথ নিই, মা-বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কোনো ত্রুটি করব না। তাদের হাসিমুখই হোক আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এএডি/


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: