বাংলা গানের অন্যতম কিংবদন্তি লাকী আখান্দের জন্মদিন আজ। তিনি নেই, কিন্তু তার গান আজও ছুঁয়ে যায় সংগীতপ্রেমীদের মনে। দেশের অন্যতম প্রথিতযশা গীতিকবি গোলাম মোর্শেদ এই কিংবদন্তির সঙ্গে এক সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ঘনিষ্ঠভাবে। লাকী আখান্দের সুর করা ও তার লেখা প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গানের সংখ্যা দেড় শতাধিক। আজ লাকী আখান্দের জন্মদিনে সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য সেই স্মৃতির কিছুটা লিখেছেন গোলাম মোর্শেদ।
লাকী আখান্দ, যাকে বাংলাদেশের আধুনিক গানের ‘নীল মনিহার’ বলা হয়, তিনি আসলে এ দেশের বাংলা গানে আধুনিকতার পোশাক পরিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং গান লেখার শুরুটা ছিল অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। লাকী আখান্দ, যাকে আমি বলতাম লাকী ভাই তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কীভাবে শুরু হলো বা কীভাবে গান লিখলাম, এটা নিয়ে আমি খুব বেশি কথা কখনোই বলিনি। আজ তার জন্মদিনে সেই স্মৃতির কিছুটা বলি।
১৯৭৬ সালে ওনার দুটো গান শুনে ওনাকে খুঁজে বের করি যে উনি কোথায় থাকেন। তখন আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। অনেক খোঁজ নিয়ে জানতে পারি উনি আজিমপুরে থাকেন এবং একদিন ওনার বাসায় গিয়ে হাজির হই। ওনার বাসায় ঢুকে বাঁদিকের একটা রুমে দেখলাম উনি একটি চৌকির মতো জায়গায় হারমোনিয়াম নিয়ে বসা এবং নিচে হ্যাপি আখান্দ গিটার বাজাচ্ছে। তখন হ্যাপি দেশের আরেক খ্যাতনামা গীতিকবি কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি এবার আসুক সারা বিশ্বময়’ গানটি প্র্যাকটিস করছিল। এরপর থেকে ওনার সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা হতো। আশির দশকে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে আমি ফরাসি ভাষা শিখতাম। সে সময় ওখানকার কালচারাল সেক্রেটারিও ছিলাম। তো সেই সময় সেখানে যেকোনো কালচারাল প্রোগ্রাম থাকলে তার দায়িত্ব আমার কাঁধেই থাকত বেশিরভাগ সময়। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই লাকী ভাই এবং হ্যাপি আখান্দ দুজনেই থাকতেন। আমাদের এই বন্ধুত্ব ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বজায় ছিল, কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি যে ওনার জন্য গান লিখব। এখানে একটু বলে রাখি তিনি আমাকে ‘মাসু’ বলে ডাকতেন। আমাকে এই নামে লাকী ভাই ছাড়া হাতে গোনা কাছের মানুষ ছাড়া কেউ ডাকে না বা জানেও না।
১৯৯৭ সালে একদিন পুরান ঢাকায় রিকশায় ওনার সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয় এবং উনি আমাকে জানান যে হ্যাপি মারা গেছে। এরপর একদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে উনি আমার অফিসে আসেন এবং আমি ওনাকে আমার অফিসে একটি রুম দেওয়ার প্রস্তাব করি। এর দুই-তিন দিন পর উনি আমাকে বলেন যে উনি আবার নতুন করে গান করা শুরু করবেন। তবে শর্ত একটাই, গানগুলো আমাকে লিখতে হবে। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম কারণ আমি গান লিখতে জানতাম না। কিন্তু ওনার জেদের কারণে আমি চার লাইন লিখলাম। ১৯৯৭ সালে যখন আমি প্রথম গান ওনাকে দিলাম, তিনি এক-দেড় মিনিট তাকিয়ে থেকে সঙ্গে সঙ্গে গিটার বা হারমোনিয়াম তুলে সুর করে ফেললেন। তার এই তাৎক্ষণিক সুর করার ক্ষমতা ছিল অবিশ্বাস্য।
সেটি ছিল লাকী ভাইয়ের সুরে আমার লেখা প্রথম গান। ‘ভালোবেসে ভুল ছিল যত’ শিরোনামের সেই গানটি গেয়েছিলেন সামিনা চৌধুরী। এরপর আমরা ১২টি গানের একটি অ্যালবাম করার পরিকল্পনা করি যেখানে সামিনা চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরীসহ ছয়জন শিল্পী গান গেয়েছিলেন। যদিও আমার প্রথম লেখা গানটি প্রথম অ্যালবামে স্থান পায়নি। এভাবেই আমার গীতিকার হিসেবে পথচলা শুরু হয়। কাওসার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গেও ওনার মাধ্যমে আমার যৌথভাবে গান লেখার সুযোগ হয়েছিল। লাকী ভাই আমার লেখা গানে কখনো কোনো শব্দ বা লাইন পরিবর্তন করতে বলতেন না, যা ছিল আমার জন্য এক বড় প্রাপ্তি।
আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’, ‘কী করে বললে তুমি’, জেমসের ‘লিখতে পারি না কোনো গান তুমি ছাড়া’, ‘ভালোবেসে চলে যেও না’, তপন চৌধুরীর ‘কোনোদিন’, ফাহমিদা নবীর ‘কী পেলে হব খুশি’, হাসানের ‘এত দূরে যে চলে গেছো’ এই জনপ্রিয় গানগুলোর সৃষ্টির পেছনে এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। লাকী ভাই চলে যাওয়ার পর তার সুর করা গান আমি কাউকে দিইনি দীর্ঘ সময়। তবে ইদানীংকালে কিছু কিছু গান আমি প্রকাশ করা শুরু করেছি। এর মধ্যে রফিকুল আলম ও প্রবাসী শিল্পী সাঈদা শম্পার দ্বৈত গান ‘তুমি আমি মিলে কেমন’, তরুণ মুন্সীর ‘যার কাছে মন রেখে’ আমার নিজের কাছে খুব পছন্দের গান। এর বাইরে আরও কিছু গান যেগুলো লাকী ভাইয়ের সুর করা সেগুলোর কাজ চলছে। আশা করছি শিগগিরই সেগুলোও মুক্ত হয়ে যাবে।
আজ লাকী ভাই নেই, কিন্তু আমি যখনই গান লিখি, মনে হয় উনি গিটার বা হারমোনিয়াম হাতে আমার পাশেই আছেন। ওনার সেই স্মৃতি এবং প্রেরণা আমার কলমের সঙ্গে সবসময় থাকে। পরিশেষে বলব, এই গুণী মানুষটিকে আমাদের দেশের শিল্পী বা গীতিকাররা হয়তো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। পারলে হয়তো ওনার মতো কিংবদন্তিকে আমরা আরও বেশি ধারণ করতে পারতাম।
অনুলিখন : মইনুল হক রোজ