চট্টগ্রামে কুরবানির চামড়ার হিসাবে তালগোল

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

সারাদেশ

চট্টগ্রাম নগরীর আড়তে এবার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখ পিসের বেশি। আর কুরবানি হয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার ২১২টি পশু।

2026-06-07T03:04:49+00:00
2026-06-07T03:04:49+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামে কুরবানির চামড়ার হিসাবে তালগোল
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ৩:০৪ এএম   (ভিজিট : ৯)
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম নগরীর আড়তে এবার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখ পিসের বেশি। আর কুরবানি হয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার ২১২টি পশু। আড়তে সংগ্রহ করা চামড়ার হিসাবের সঙ্গে মিল নেই প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে। কুরবানি ও সংগৃহীত চামড়ার হিসাবে আছে বড় ব্যবধান। অন্তত তিন লাখ পিস পশুর চামড়ার হিসাব নেই আড়ত ও প্রাণিসম্পদ দফতরে। কুরবানির পর বিক্রি না হওয়ায় কিছু নষ্ট চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। তবে তিন লাখ পিস চামড়া নষ্ট হওয়ার তথ্য নেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এবং আড়তদারদের কাছে। আবার আড়তে চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে এমন অভিযোগও উঠেছে। 

আড়তদাররা জানান, এবার নগরীর বিভিন্ন আড়তে গরু ছাগল মহিষের ৪ লাখ ১১ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। কুরবানির তুলনায় চামড়া সংগ্রহ হয়েছে অন্তত তিন লাখ পিস কম। বিপুল চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন আড়তদাররা। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর মনে করছে, পিস হিসেবে আড়তে সংগ্রহ দেখানো হয়েছে কম। আবার ১ লাখ ৯০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ হয়েছে আড়তের বাইরে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানায়। সেই চামড়ার হিসাব নেই আড়তে। তাই আড়তে চামড়ার হিসাব কম। 

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর সময়ের আলোকে বলেন, কুরবানি হয়েছে সংগৃহীত চামড়ার হিসাবের বেশি। ৭ লাখের বেশি কুরবানি হলেও আড়তে সংগ্রহ দেখানো হয়েছে কম। তাই প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সঙ্গে আড়তের হিসাব মিলছে না। 

হিসাবে এত ফারাক কেন এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে বলা যায়, সব দিক বিবেচনা করে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে কুরবানির হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তবে কুরবানির হিসাবে ভুল তথ্য থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিসিক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক এস এম আলমগীর আল কাদেরী। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কুরবানির তথ্য দিয়েছে আমাদের। পরে আমাদের অনুসন্ধানে জানতে পেরেছি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা ও ফেনী জেলার হিসাবও চট্টগ্রাম জেলার কুরবানির হিসাবে যুক্ত করা হয়েছে। যার কারণে সংগৃহীত চামড়ার হিসাবের সঙ্গে কুরবানির হিসাবে গরমিল দেখা যাচ্ছে। 

ছোট পশু বিশেষ করে ছাগল ভেড়ার চামড়া বেশিরভাগ নষ্ট হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গরুর চামড়া তেমন নষ্ট হয়েছে মনে হয় না। কিন্তু ছাগল ভেড়ার চামড়া কেনেনি কেউ। সংখ্যায় ছাগল ভেড়ার চামড়া আড়াই লাখ পিসের কম হবে না। বলতে গেলে ছোট পশুর চামড়া বিপুল পরিমাণ নষ্ট হয়েছে। তবে গরু-মহিষের চামড়া এত নষ্ট হয়নি।

চসিকের উপপরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্ম্মা সময়ের আলোকে বলেন, কুরবানির দিন থেকে কুরবানির পরদিন পর্যন্ত আমি মাঠে ছিলাম। বর্জ্য পরিচ্ছন্নের কাজ করার সময় দেখেছি কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। এসব চামড়া আমাদের বিভাগের নির্ধারিত গাড়িতে করে ভাগাড়ে নিয়ে গেছি। তবে তিন লাখ পিস চামড়া নষ্ট হওয়া অবিশ্বাস্য। আমার মনে হয় আড়তদার ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে কোথাও ত্রুটি আছে। 

এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর আতুরার ডিপো, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ৩০ আড়তে প্রক্রিয়াজাত করা আছে বিপুল চামড়া। আড়তদাররা দিন গুনছেন কবে বিক্রি শুরু হবে ঢাকার ট্যানারিতে। কয়েক দিন আগে এক ট্যানারি মালিক এসে কেবল দরদাম করে গেছেন। কেনার তেমন আগ্রহ দেখাননি। আড়তদারদের প্রত্যাশা ১০/১৫ দিনের মধ্যে ঢাকা থেকে ট্যানারির লোকজন আসবেন। এরপর পুরোদমে বিক্রি শুরু হবে।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, এবার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে গত বছরের চেয়ে কম। গত বছর ৪ লাখ ১৬ হাজার পিস সংগ্রহ হয়েছে। এবার সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখ ১১ হাজার পিস। এর মধ্যে ছাগলের চামড়া আছে ৫৩ হাজার ৮০০ পিস। ১১ হাজার পিস চামড়া মহিষের। 

বিক্রি এখনও শুরু হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার ট্যানারির লোকজন এসেছিল। দরদাম করে গেছেন কিন্তু কেনা শুরু করেনি। আশা করি ১০/১৫ দিনের মধ্যে ট্যানারির লোকজন আসবে। তখন চামড়া কেনাবেচা শুরু হবে। 

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কুরবানির পরিমাণ হিসাব করেছে ৭ লাখের বেশি। সেই হিসেবে চামড়া আরও বেশি সংগ্রহ হওয়ার কথা ছিল। কম চামড়া কেন সংগ্রহ হলো এ প্রশ্নে তিনি বলেন, জানি না এত কম চামড়া কেন সংগ্রহ হলো। হয়তো বহু চামড়া নষ্ট হয়েছে তাই। 

আতুড়ার ডিপোর চামড়ার আড়তদার মোহাম্মদ আলী বলেন, কুরবানিদাতা কমেনি। অন্তত আমি মনে করি কুরবানিদাতা বেড়েছে। তবে চামড়া সংগ্রহ হয়েছে কম। আমি মনে করি একমাত্র কারণ বিপুল চামড়া নষ্ট হয়েছে। তাই কুরবানিদাতার তুলনায় চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে কম।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় এবার কুরবানি হয়েছে মোট ৭ লাখ ৪০ হাজার ২১২টি পশু। এবার এই জেলায় গত বছরের তুলনায় ৪১ হাজার ৬১৯টি পশু কম কুরবানি হয়েছে। ২০২৫ সালে কুরবানি করা হয়েছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৩১টি পশু।

আগের কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কুরবানি হয়েছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু। ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৩১টিতে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালেও পশু কুরবানি কম হয়। 

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, এবার গরু কুরবানি হয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৭৪০টি। মহিষ কুরবানি হয়েছে ৩০ হাজার ৩২০টি। ছাগল কুরবানি হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৩৫০টি। ভেড়া কুরবানি হয়েছে ৩৯ হাজার ৬৫০টি। এ ছাড়া দুম্বা ও গাড়ল কুরবানি হয়েছে ১৫২টি।

প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্যে দেখা যায়, ছাগল ভেড়া মিলিয়ে কুরবানি হয়েছে আড়াই লাখ। কিন্তু ছাগল ভেড়ার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে ৫৫ হাজার ৮০০ পিস। আড়তে সংগ্রহ করা চামড়া হিসাব করলে দেখা যায় অন্তত দুই লাখ পিস ছাগল ভেড়ার চামড়া নষ্ট হয়েছে। 

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, এবার বিপুল চামড়া নষ্ট হয়েছে বলা হলেও আসলে কোথায় গেছে বড় প্রশ্ন হিসাবে দেখা দিয়েছে। কারণ কুরবানির হিসাবের সঙ্গে চামড়া সংগ্রহের হিসাবের তথ্য সঙ্গে মিলছে না। চামড়া দেশের অর্থনীতির একটি বড় উপাদান। সারা বছরেই হিসাবে শত কোটির ব্যবসা এই খাতে। তাই সরকারের কাছে দেশের একটি অংশের চামড়া ও কুরবানির সঠিক তথ্য পৌঁছানো জরুরি।

আরবিএন 




  বিষয়:   চট্টগ্রাম  প্রাণিসম্পদ অধিদফতর  চামড়া 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: