প্রায় ষোল বছরে কেউ খোঁজ রাখেনি চরমধুয়া নামাপাড়া ও চরমধুয়া দড়িপাড়া গ্রামের নদী ভাঙনের। অব্যাহত ভাঙনের ফলে মৃগী নদীর পেটে ইতিমধ্যেই চলে গেছে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা। এ দেড় কিলোমিটার জুড়েই রয়েছে স্থানীয়দের বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁশের ঝাড় ও গাছপালা হারানোর হাহাকার। কেউ বা একমাত্র সম্বল বসতভিটা হারিয়ে হয়েছেন নিঃস্ব।
নামাপাড়ায় চলাচলের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় বিচ্ছিন্ন একটি জনপদে যেন পরিণত হয়েছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাসের এ পাড়াটি। রাস্তাঘাট না থাকায় এখনো ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। তবু কারও চোখ পড়েনি এই এলাকা। বর্তমান বাংলাদেশেও এমনই বৈষম্যের শিকার হয়েছে শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের এ গ্রামটি।
নকলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে মৃগী নদীর দুই তীর ঘেঁষে দাড়িয়ে গ্রামটি চরমধুয়া। এর একপাশে পাশে চরমধুয়া নামাপাড়া ও অপর পাশে চরমধুয়া দড়িপাড়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ষোল বছর ধরে এ গ্রামের বুকচিরে বয়ে যাওয়া মৃগী নদী অব্যাহত ভাঙনের মুখে পড়েছে। বিগত বছরগুলোতে ভাঙন স্বাভাবিক থাকলেও চলতি বর্ষায় ভাঙন বেড়েছে আশঙ্কাজনকহারে। গত ২৫ জুলাই এক দিনেই নামাপাড়ায় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ৫টি বসতবাড়ি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আকস্মিক এ ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ওইসব পরিবার। এইভাবে গত ষোল বছর ধরেই কারও ফসলি জমি, কারও বসতবাড়ি, কারও ভিটেমাটি, কারও বাঁশের ঝাড়, কারও বা গাছপালা তলিয়ে গেছে নদীর পেটে। ক্ষুধার্ত নদীর তলদেশে হারিয়ে গেছে গ্রামের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটিও। ফলে পাড়ার বাসিন্দাদের নদীর তীর ধরে ফসলি জমি মাড়িয়ে চলতে হয়। কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া বা অন্য যে কোন পরিবহণের কাজে আজও ব্যবহার করতে হয় ঘোড়ার গাড়ি। যা আবার ঠেলে পার করতে হয়। স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল ঘরটিও এখন ভাঙনের কবলে। নদী আর যৎসামান্য আগালেই এসবও বিলীন হবে চিরতরে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখনো পর্যন্ত অন্তত ৪০-৫০টি বসতবাড়ি নদীর পেটে জায়গা পেয়েছে। অথচ বিগত বছরগুলোতে নদী ভাঙন রোধে টেকসই তো দূরের কথা, অস্থায়ী কোন পদক্ষেপও হাতে নেয়নি। এমনকি স্থানীয়দের সাময়িক সহায়তাও এগিয়ে আসেনি কেউ। বর্তমান বাংলাদেশে এ যেন এক বৈষম্যের বিচ্ছিন্ন জনপদ।
স্থানীয় বাসিন্দা শাফিকুল ইসলাম জানান, গত প্রায় ১৫-১৬ বছর চরমধুয়া নামাপাড়ায় যাবত এই নদী ভাঙতেছে। রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি সব নদীতে চলে যাচ্ছে। আমরা দুই পায়ে হেঁটে যাব, এই রাস্তাটিও নেই। সরকার আমাদের দেখে না। আমরা কি এই দেশের বাসিন্দা না?
কৃষক সায়েল মিয়া জানান, ঘরবাড়ি সব ভাইঙ্গা নদীতে যাইতাছে গা। চলাচলের রাস্তা নাই। আমরা এখন যাব কই?
গৃহবধূ খাদিজা বেগম জানান, আমার প্রায় ৫-৬ কাঠা জমি নদীতে চলে গেছে। প্রায় ৫ লাখ টাকার বাঁশের ঝাড় ছিল। আম গাছ, কাঁঠাল গাছ ছিল। সব নদীতে চলে গেছে। এখন ঘরটিও যাওয়ার পথে। সরকার কোন পদক্ষেপ নেয়নি।
অপর বাসিন্দা হাসান মিয়া জানান, প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে নদীতে ভাঙতেছে। আজ প্রায় ষোল বছর ধরে নদী ভাঙতেছে। কিন্তু কেউ কিছু করেনি।
ভুক্তভোগী মোজাফফর হোসেন জানান, যাদের জায়গা আছে তারা দূরে গেছে। আমাদের যাওয়ার মতো কোন জায়গা নেই। এখন আমরা কোথায় যাব?
নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, চরমধুয়া নামাপাড়া ও চরমধুয়া দড়িপাড়ায় প্রায় ৩০-৪০টি বসতঘর নদীতে তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসক স্যারের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাতে করে, অতিদ্রুত এখানে প্রতিরক্ষা কাজ করা যায়। পাশাপাশি কিভাবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা যায়, তা নিয়েও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।
সময়ের আলো/আতা