গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, রোববার (৭ জুন) তা পূর্ণ করল ১০০ দিন। এই এক শত দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ সম্পূর্ণ পালটে গেছে। রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের জেরে একদিকে যেমন নিহত হয়েছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তেমনই বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে; যার ফলশ্রুতিতে অঞ্চলটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও জটিল মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
গলফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিল মাসে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত ও কার্যকর হলেও অঞ্চলের থমথমে পরিস্থিতি এতটুকুও প্রশমিত হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে কৌশলগত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ এখনো কার্যত অবরুদ্ধ, লেবানন সীমান্তে অব্যাহত রয়েছে চরম উত্তেজনা এবং সর্বোপরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতায় কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা এখনো সুদূরপরাহত। সংঘাতের এই শততম দিনে এসে কূটনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিলেন, তা আদতে কতটুকু সফল হয়েছে?
যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে হোয়াইট হাউস তথা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মূলত তিনটি- প্রথমত, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত অর্জন থেকে চিরতরে বিরত রাখা; দ্বিতীয়ত, তেহরানের সামরিক অবকাঠামো ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত তাদের আঞ্চলিক ছায়াবাহিনী বা প্রক্সি নেটওয়ার্ককে গুঁড়িয়ে দেওয়া; এবং তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর শর্তাবলি মেনে ইরানকে একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা।
সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ বাহিনী আংশিক সফলতা লাভ করেছে। তাদের উপর্যুপরি ও বিধ্বংসী বিমান এবং ড্রোন হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতিসাধন সম্ভব হয়েছে। উপরন্তু, একের পর এক শীর্ষ স্তরের অধিনায়কদের হারিয়ে তেহরান নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। তবে ট্রাম্পের মূল রাজনৈতিক অভীষ্ট বা বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো এখনো সম্পূর্ণ অর্জিত হয়নি। তেহরান এখনো আমেরিকার একপেশে শর্তের সামনে পুরোপুরি নতি স্বীকার করেনি এবং কোনো ব্যাপকভিত্তিক চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি।
যদিও সামরিক শক্তিতে ইরান মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের চেয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে, তবে নিজেদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত ‘লিভারেজ’ বা চালিকাশক্তি ব্যবহার করে তারা ওয়াশিংটনকে প্রতিনিয়ত চাপে রেখেছে। আর এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালী’।
সামরিক বিশ্লেষকদের প্রাথমিক ধারণা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু এটি যে টানা ১০০ দিন ধরে অবরুদ্ধ ও অচল থাকবে এবং ইরানের সবচেয়ে মোক্ষম পাল্টা চাল বা অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হবে, তা কেউ অনুমান করতে পারেনি। বিশ্বের মোট পরিবাহিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে। ইরান কর্তৃক এই রুট কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে আকাশচুম্বী হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ-বীমার ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তেহরান মূলত এই জলপথকে অবরুদ্ধ করে ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিয়েছে, মাঝেমধ্যে কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং চরম অর্থনৈতিক চাপও বিশ্বরাজনীতিতে সমানভাবে বিধ্বংসী হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ৬ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কেবল বড় আকারের আকাশ ও স্থল অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মাত্র, কিন্তু স্থায়ী শান্তি ফেরাতে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটির আশপাশে ঘটে যাওয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। একই সাথে, লেবানন ফ্রন্ট বর্তমানে একটি ব্যাপকভিত্তিক স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বা জট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো লেবাননের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অপরপক্ষে, তেহরানের স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান হলো— লেবানন ফ্রন্টের গতিপ্রকৃতি ও ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তারা আমেরিকার সাথে কোনো প্রকার চূড়ান্ত বা স্থায়ী চুক্তিতে উপনীত হবে না।
/কহু