বাগেরহাটের সাড়ে ছয়শত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দীঘি থেকে একমাত্র কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাজারের খাদেম ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ঐতিহ্যবাহী এই দীঘির ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে যেকোনো মূল্যে কুমিরটি পুনরায় অবমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার (৭ জুন) দুপুরে বাগেরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মাজারের খাদেমরা এই দাবি উত্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাজারের প্রধান খাদেম ও সাবেক যুবদল নেতা ফকির তারিকুল ইসলাম। এ সময় মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ অর্ধশতাধিক স্থানীয় অধিবাসী উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মাজার কর্তৃপক্ষের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা বা অনুমতি না নিয়েই প্রশাসন দীঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নিয়েছে, যা বাগেরহাটের শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে এক ধরনের ‘প্রতারণা’। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এর আগেও চিকিৎসার নাম করে দীঘি থেকে দুটি কুমির নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়নি। আমাদের সাফ কথা— যেকোনো মূল্যে দীঘির কুমির ফেরত দিতে হবে। ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজনে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’
ইতিহাসের পাতা ও স্থানীয় ঐতিহ্য সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে হযরত খানজাহান আলী (রহ.) এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও স্থানীয় মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করতে এই বিশাল দীঘিটি খনন করেছিলেন। দীঘির পানির সুরক্ষায় তিনি নিজেই ‘ধলা পাহাড়’ ও ‘কালা পাহাড়’ নামে দুটি কুমির এনে পানিতে ছেড়েছিলেন। সেই থেকে মাজারের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় কুমিরের নাম।
তবে কালক্রমে প্রজনন না হওয়া, অসচেতনতাবশত ঘুমের ওষুধ প্রয়োগ এবং মাছ ধরার জালে আটকে গুরুতর আহত হওয়ার কারণে খানজাহানের বংশানুক্রমিক কুমিরগুলো মারা যেতে শুরু করে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খানজাহানের ছাড়া আদি কুমির বংশের সর্বশেষ সদস্যটির মৃত্যু ঘটে। পরবর্তীতে ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা ৬টি কুমির এই দীঘিতে ছাড়া হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সেগুলোরও বেশিরভাগ মারা যায়। সর্বশেষ দুটি কুমিরের একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যাওয়ার পর দীঘিতে কেবল একটি কুমিরই অবশিষ্ট ছিল।
দীঘির একমাত্র কুমিরটি গত কিছুদিল ধরে তীব্র হিংস্র হয়ে উঠেছিল এবং একাধিকবার মানুষ ও গবাদি পশুকে আক্রমণ করছিল। গত এপ্রিল মাসে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এরপর গত ১ জুন সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দীঘির পূর্ব পাশে নারীদের ঘাটে গোসল করতে নেমে ফাতেমা আক্তার (৭) নামে এক শিশু কুমিরের গ্রাসে পরিণত হয়। কুমিরটি শিশুটিকে টেনে দীঘির অতল তলিয়ে নিয়ে যায়। পরদিন ২ জুন ভোরে ওই শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর দীঘিতে আসা হাজারো দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গত ৩ জুন কুমিরটিকে ধরে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘ সাড়ে ৬০০ বছরের প্রাচীন কুমির ইতিহাসের সাময়িক অবসান ঘটে।
/কহু