ইরানের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে মৃত্যুর ১০০ দিন পরও দাফন করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হওয়ার পর থেকে তার শেষকৃত্য বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।
একই হামলায় নিহত বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি ব্যক্তিত্বকে ইতোমধ্যে দাফন করা হলেও, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়া খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খামেনির জন্য একটি বৃহৎ ও বহু-শহরব্যাপী শোকযাত্রার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তার মরদেহ প্রথমে তেহরান, পরে কোম এবং শেষ পর্যন্ত মাশহাদে নেওয়া হবে। তার ইচ্ছানুসারে মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে সমাহিত করার কথা রয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
এই বিলম্ব বিশেষভাবে নজর কাড়ছে, কারণ শিয়া ইসলামী রীতি অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করা হয়, যদি না কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি থাকে।
কেন বিলম্ব হচ্ছে
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ক্ষমতা হস্তান্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বিলম্বের অন্যতম কারণ হতে পারে। খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তিনি এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে খুব কমই এসেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি রাজনৈতিক বৈধতা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এমন অনুষ্ঠানে মোজতবা খামেনির প্রকাশ্য উপস্থিতি ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এদিকে ইরানের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে জুন মাসের শেষভাগে বা ইরানি ক্যালেন্ডারের খোরদাদ মাস শেষ হওয়ার আগে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হতে পারে। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি আরও সুসংগঠিত করার জন্য সময় বাড়ানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
দেহাবশেষের অবস্থা নিয়ে বাড়ছে জল্পনা
দীর্ঘ বিলম্বের কারণে আলী খামেনির দেহাবশেষের বর্তমান অবস্থা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনও প্রকাশ করেনি যে তার মরদেহ কোথায় সংরক্ষণ করা হয়েছে কিংবা হামলার সময় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতিকে জটিল করে তুলেছে কি না।
একই হামলায় নিহত অন্যান্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, কিছু মরদেহ কয়েক সপ্তাহ পর উদ্ধার করা হয়েছিল এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছিল। ফলে খামেনির মরদেহ নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ইরানের শীর্ষ নেতাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঐতিহাসিকভাবে বড় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হিসেবেও বিবেচিত হয়ে থাকে।
এর আগে ২০২০ সালে নিহত বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির শেষকৃত্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হয়েছিল। কেরমানে দাফনের আগে তার মরদেহ ইরাক ও ইরানের বিভিন্ন শহরে নেওয়া হয়। সে সময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই শোকযাত্রাকে জাতীয় ঐক্য ও সরকারের প্রতি জনসমর্থনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিল।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, খামেনির শেষকৃত্যেও ইরানি কর্তৃপক্ষ একই ধরনের ব্যাপক জনসমাগম নিশ্চিত করতে চাইতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এমন একটি বৃহৎ আয়োজন পরিচালনা করা উল্লেখযোগ্য লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরান
বর্তমানে ইরান একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর ১০০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার শেষকৃত্যের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
দেশটি নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করলেও তাকে এখনো ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে, সাবেক নেতার জন্য একটি ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে ইরানের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এবং খামেনির শেষকৃত্য— উভয় বিষয়ই এখনো অনিশ্চয়তা ও নানা প্রশ্নের মধ্যে রয়ে গেছে।
/ইউএমএইচ