কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গৃহবধূ সুখী খাতুনকে (৩২) ব্ল্যাকমেইল ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহতের বাবা-মা।
রোববার (৭ জুন) বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহতের বাবা মো. বকুল শেখ ও মা রাবেয়া খাতুন এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে ও কুষ্টিয়া আদালতে দায়েরকৃত মামলার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ বছর আগে ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের কুচিয়ামোড়া গ্রামের বকুল শেখের মেয়ে সুখী খাতুনের সাথে একই ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের প্রবাসী সাইফুল ইসলামের বিয়ে হয়।
স্বামী প্রবাসে থাকার সুযোগে পাশের গ্রামের বাসিন্দা সম্পর্কে ভাতিজা মো. ফয়সাল তাদের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। একপর্যায়ে ফয়সাল গোপনে সুখীর ছবি তুলে তা এডিটিং বা সুপারইম্পোজের মাধ্যমে অশ্লীল ছবি বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে এবং বিভিন্ন সময় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনকি সুখীর নামে এনজিও থেকে ঋণ তুলে সেই টাকাও ফয়সাল জোরপূর্বক নিয়ে যান।
বকুল শেখ অভিযোগ করেন, ফয়সালের এই নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে সুখী বিষয়টি তার পিতা-মাতাকে জানালে ফয়সাল ক্ষিপ্ত হয়। এরই জেরে গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ সকালে ফয়সাল সুখীর বাড়িতে গিয়ে তার ওপর চড়াও হয়। সেখানে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সুখীকে মারধর ও গলা টিপে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে সুখীর মরদেহ খাটের ওপর বসা অবস্থায় রেখে সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে ফয়সাল পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠায় এবং প্রাথমিকভাবে ভেড়ামারা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়।
নিহতের পরিবার ময়নাতদন্ত রিপোর্টের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে জানায়, রিপোর্টে যা উল্লেখ রয়েছে সেটা স্পষ্টত আঘাতজনিত কারণে মৃত্যুর প্রমাণ বহন করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে ডাক্তার রিপোর্টে ‘অ্যাসফিক্সিয়া এজ এ রেজাল্ট অফ হ্যাঙ্গিং’ (ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসরোধ) মর্মে চূড়ান্ত মতামত দেন।
পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা দেখানোর অপচেষ্টা।
এই ঘটনায় গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে সুখী খাতুনের ভাই মো. রুহুল আমিন বাদী হয়ে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মূল অভিযুক্ত মো. ফয়সাল, তার পিতা আলাউদ্দিন এবং ভাবি কাকলী খাতুনকে আসামি করা হয়। মামলার বিবরণে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর আসামি ফয়সাল সুখীর মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায় এবং তার পিতা আলাউদ্দিন সুখীর নামের সিমটি ভেঙে আলামত ধ্বংসের চেষ্টা করে। ঘটনার পর থেকেই প্রধান আসামি ফয়সাল পলাতক রয়েছে।
এ বিষয়ে ভেড়ামারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ‘গত ৫ এপ্রিল সুখী খাতুনের মৃত্যুর পর তার পিতা বকুল হোসেন (শেখ) থানায় মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে মৌখিক তথ্য দিয়েছিলেন এবং তার ভিত্তিতেই একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন আসায় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আমিনুল ইসলাম গত ১৩ মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।’
আদালতে নতুন করে হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘আদালতে মামলার বিষয়টি আমরা শুনেছি। তবে এখনো আমাদের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো আদালতের নির্দেশনা বা কাগজপত্র আসেনি। কাগজপত্র হাতে পেলে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সময়ের আলো/জেডি