নীরব সংকেতগুলো অবহেলা নয়

অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার

ফিচার

ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে শরীর

2026-06-08T04:17:48+00:00
2026-06-08T04:17:48+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
ফিচার
নীরব সংকেতগুলো অবহেলা নয়
অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৪:১৭ এএম   (ভিজিট : ৭)
ছবি : সংগৃহীত
ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ করে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে শরীর আগে থেকেই নানা ধরনের সতর্ক সংকেত দিতে থাকে, কিন্তু আমরা সেগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করি। ফলে রোগটি ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, যখন চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়।

ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের কাশি, খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, শরীরের কোনো অংশে গিঁট বা ফোলা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি। অনেক সময় মুখে ঘা দীর্ঘদিন ভালো না হওয়া, ত্বকের তিলের আকৃতি বা রং পরিবর্তন কিংবা মলমূত্রের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তনও ক্যানসারের ইঙ্গিত হতে পারে।

বিশেষ করে দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো উপসর্গ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। সব উপসর্গই যে ক্যানসারের কারণে হবে তা নয়। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মনে রাখতে হবে, ক্যানসার যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।

তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে ক্যানসার
একসময় ক্যানসারকে মূলত বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের হার বাড়ছে। স্তন ক্যানসার, কোলোরেক্টাল ক্যানসার, থাইরয়েড ক্যানসার এবং কিছু রক্তের ক্যানসার এখন তুলনামূলক কম বয়সিদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো জীবনযাপনের পরিবর্তন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবেশ দূষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তরুণরা সাধারণত নিজেদের সুস্থ মনে করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হন না। ফলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়। তাই বয়স কম হলেও দীর্ঘদিনের কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। 

ক্যানসার প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল অভ্যাসের কারণে বড় বিপদ
ক্যানসারের সব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ধূমপান ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ। শুধু ফুসফুস নয়, মুখ, গলা, খাদ্যনালি, মূত্রথলি এবং আরও অনেক ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যও সমান ক্ষতিকর।

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, প্রক্রিয়াজাত ও পোড়া খাবার নিয়মিত খাওয়া ক্যানসারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে। অন্যদিকে ফলমূল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থূলতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব শরীরে নানা ধরনের জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া অতিরিক্ত রোদে থাকা, দূষিত পরিবেশে বসবাস, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শুধু ক্যানসার নয়, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বহু দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক।

সচেতনতা ও নিয়মিত পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
পরিবারে কারও ক্যানসার থাকলে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয় যে তারও একই রোগ হবে কি না। বাস্তবে সব ক্যানসার বংশগত নয়, তবে কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে পারিবারিক ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি বাবা-মা, ভাই-বোন বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে অল্প বয়সে ক্যানসার হয়ে থাকে, তা হলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো উচিত। 

প্রয়োজনে জেনেটিক কাউন্সেলিং বা বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। পারিবারিক ঝুঁকি থাকলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ধূমপান বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। অনেকেই ভয় পেয়ে পরীক্ষা এড়িয়ে চলেন, যা ভুল সিদ্ধান্ত। বরং সময়মতো পরীক্ষা করলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। 

পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও নিয়মিত চিকিৎসা, পরামর্শই হওয়া উচিত প্রধান করণীয়। সঠিক তথ্য জানা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই ক্যানসার মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

লেখক : সাবেক বিভাগীয় প্রধান, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট 

/এসএকে


  বিষয়:   নীরব  সংকেত  অবহেলা  ক্যানসার 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: