বিখ্যাত ফরাসি সমুদ্র গবেষক ও অভিযাত্রী জ্যাক কুস্তো বলেছিলেন, 'The sea, once it casts its spell, holds one in its net of wonder forever.' অর্থাৎ, ‘সমুদ্র একবার কাউকে তার মায়াজালে আবদ্ধ করতে পারলে, সে মানুষ সারাজীবন তার বিস্ময়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে!’
সমুদ্রের বিশালতা, রহস্য, জীববৈচিত্র্য, অজানা জগৎ এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল প্রকৃতি মানুষকে বারবার তার কাছে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু সমুদ্র মানুষকে শুধু মুগ্ধই করে না, তাকে দায়িত্বভারও দেয়। কেউ সেই দায়িত্ব নেয় গবেষণার মাধ্যমে, কেউ মানুষের জীবন বাঁচিয়ে, কেউবা জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির দিকে তাকালে আমরা সাধারণত দেখি উত্তাল ঢেউ, অথই নীল জলরাশি, জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা কিংবা পর্যটকদের ভিড়। কিন্তু এই সমুদ্রের সম্পদ রক্ষা করতে এবং মানুষের জীবন বাঁচাতে যারা কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই থেকে যান আড়ালে। একজন গবেষক, জেলে, লাইফগার্ড বা পরিবেশকর্মী- যে-ই সমুদ্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হন, তিনি কেবল পেশাগত কারণে নয়, আবেগ ও ভালোবাসা থেকেও সমুদ্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। তারা বঙ্গোপসাগরের অজানা নায়ক।
সমুদ্রের ভাষা পড়েন যারা
সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবনচক্র নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন সমুদ্র গবেষকরা। ছবি : এআই
ভোরের আলো ফোটার আগেই গবেষণা জাহাজ বা ছোট ট্রলারে চড়ে সমুদ্রে যাত্রা করেন সামুদ্রিক গবেষকেরা। তাদের কাজ শুধু মাছের সংখ্যা গোনা নয়। তারা সমুদ্রের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, দূষণ, প্রবালপ্রাচীর, ডলফিন, হাঙর কিংবা সামুদ্রিক কচ্ছপের জীবনচক্র নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
একজন গবেষকের কাছে বঙ্গোপসাগর একটি জীবন্ত গবেষণাগার। কোথাও মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে কেন, কোথায় প্লাস্টিক দূষণ কতটা ভয়াবহ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন তারা। তাদের কাজের ফলাফল সাধারণ মানুষের চোখে খুব একটা পড়ে না। কিন্তু কোনো এলাকায় মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা কিংবা দুর্যোগ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা তৈরির পেছনে তাদের গবেষণাই বড় ভূমিকা রাখে।
সমুদ্রসীমার অতন্দ্র প্রহরী
সার্বভৌমত্বের প্রহরীরা নিরলস কাজ করেন সমুদ্রে। ছবি : এআই
যেকোনো দেশের নৌবাহিনী নিজ ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমুদ্রের বুকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। একইভাবে বাংলাদেশের গৌরবের প্রতীক হয়ে নিরলসভাবে কাজ করে এ সার্বভৌমত্বের প্রহরীরা। দিন-রাত, ঝড়-তুফান কিংবা উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে তারা দেশের সামুদ্রিক সীমানা, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সবসময় সতর্ক থাকে। তারা সমুদ্রে টহল দিয়ে জলদস্যুতা, চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত জেলে ও নাবিকদের উদ্ধারেও মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধই যাদের জীবন
সংকটের মুহূর্তে ছুটে আসেন লাইফগার্ডরা। ছবি : এআই
পর্যটকদের কাছে সমুদ্রসৈকত আনন্দের জায়গা। কিন্তু লাইফগার্ডদের কাছে এটি দায়িত্বের ক্ষেত্র। প্রতি বছর ছুটির মৌসুমে হাজারো মানুষ সমুদ্রে নামেন। অনেকেই জানেন না সাগরের বিপজ্জনক স্রোতের কথা। হঠাৎ একটি ঢেউ, সামান্য অসাবধানতা কিংবা স্রোতের টান মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে জীবন। সেই সংকটের মুহূর্তে ছুটে আসেন লাইফগার্ডরা।
তপ্ত রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টহল দেওয়া, বিপদসংকেত তুলে ধরা, পর্যটকদের সতর্ক করা এবং প্রয়োজনে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া- এসবই তাদের প্রতিদিনের কাজ। অনেক সময় একটি সফল উদ্ধার অভিযানের পরও তারা সংবাদে বিশেষ কোনো জায়গা পান না। কিন্তু যাদের সন্তান, বন্ধু বা স্বজন ফিরে আসে জীবিত অবস্থায়, তাদের কাছে লাইফগার্ডরাই প্রকৃত নায়ক।
দুর্যোগের প্রথম যোদ্ধা
সমুদ্রতীর পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকেন স্বেচ্ছাসেবকরা। ছবি : এআই
বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তন এখানকার মানুষের পরিচিত বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা জারি হলে সবচেয়ে আগে মাঠে নামেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা। তারা মাইকিং করেন, মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান, বৃদ্ধ ও শিশুদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। অনেক সময় প্রবল বাতাস আর বৃষ্টির মধ্যেও তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্ক করেন।
দুর্যোগের পর তাদের কাজ আরও বাড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা, ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া- সবকিছুতেই তারা সামনের সারিতে থাকেন। এ ছাড়া সমুদ্রতীর পরিচ্ছন্নতার কাজও তারা করে থাকেন।
তাদের এসব কাজের উল্লেখযোগ্য কোনো স্বীকৃতি নেই। তবুও তারা বিবেকের তাড়নায় এই সেবামূলক কাজ করে থাকেন। তারা এটা বোঝেন, সময়মতো একটি সতর্কবার্তা হয়ত একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
সমুদ্রের সন্তান
সমুদ্রের সঙ্গে জেলেদের সম্পর্ক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে। ছবি : এআই
বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে জেলেদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তারা শুধু মাছ ধরেন না, সমুদ্রকে কাছ থেকে জানেন, অনুভব করেন। জেলেরা যেন সমুদ্রেরই সন্তান কিংবা অকৃত্রিম বন্ধু। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে। ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার আগেই অনেক অভিজ্ঞ জেলে আকাশের রং, বাতাসের গতি কিংবা ঢেউয়ের আচরণ দেখে বিপদের আভাস পান।
জেলেদের জীবন সহজ নয়। অনিশ্চিত আয়, বৈরী আবহাওয়া, সমুদ্রে দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সংগ্রাম চিরকালীন। তারপরও তারা প্রতিদিন সমুদ্রে যান, কারণ তাদের ওপর নির্ভর করে লাখো মানুষের খাদ্য ও জীবিকা।
অনেক জেলে পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখেন। তারা ছোট মাছ না ধরা, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার না করা কিংবা কচ্ছপ ও ডলফিন জালে আটকে গেলে ছেড়ে দেওয়ার মতো সচেতনতামূলক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন।
কচ্ছপের পাহারাদার
কচ্ছপ রক্ষাকারী স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর সৈকতে টহল দেন। ছবি : সংগৃহীত
রাত গভীর হলে যখন সৈকত ফাঁকা হয়ে যায়, তখন শুরু হয় আরেকদল নীরব প্রহরীর কাজ। সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য নির্জন সৈকত খোঁজে। কিন্তু পর্যটনের বিস্তার, কৃত্রিম আলো, প্লাস্টিক দূষণ এবং শিকারিদের কারণে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
কচ্ছপ রক্ষাকারী স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর সৈকতে টহল দেন। তারা ডিম পাড়ার স্থান চিহ্নিত করেন, নিরাপদে সংরক্ষণ করেন এবং বাচ্চা কচ্ছপ ফুটে বের হলে সমুদ্রে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেন। একটি কচ্ছপের বাচ্চা সমুদ্রে পৌঁছানো হয়ত ছোট ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু সেই ছোট্ট প্রাণটিই পরবর্তীতে আবার একই উপকূলে ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে। প্রতিটি সফল সংরক্ষণ প্রচেষ্টাই আসলে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মৎস্যসম্পদ, বন্দর, পর্যটন এবং উপকূলীয় জীবনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সমুদ্রকে বুঝতে গবেষক প্রয়োজন। মানুষের জীবন বাঁচাতে লাইফগার্ড প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য জেলে প্রয়োজন। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন কচ্ছপের পাহারাদার। তাদের প্রত্যেকে আলাদা ভূমিকা পালন করলেও লক্ষ্য একটাই- সমুদ্র এবং মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
আমরা সাধারণত নায়ক বলতে বুঝি রঙিন পর্দার মানুষদের। কিন্তু প্রকৃত নায়ক অনেক সময়ই ক্যামেরার বাইরে থাকেন। তারা হয়ত কোনো পুরস্কার পান না কিংবা তাদের নাম আমরা জানিও না। তবু ঝড়ের রাতে যে স্বেচ্ছাসেবক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়, যে লাইফগার্ড উত্তাল ঢেউয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের জীবন বাঁচায়, যে গবেষক বছরের পর বছর তথ্য সংগ্রহ করে সমুদ্রকে বুঝতে সাহায্য করেন, যে জেলে মাছ ধরে পৌঁছে দেন মানুষের খাবারের প্লেটে কিংবা যে ব্যক্তি রাতভর কচ্ছপের ডিম পাহারা দেয়- তাদের কারণেই বঙ্গোপসাগর আরও নিরাপদ, আরও জীবন্ত। সমুদ্রের ইতিহাসে তাদের অবদান অমলিন।