ভূ-রাজনীতির চরম উত্তেজনা ও পালাবদলের মধ্যে দীর্ঘ সাত বছর পর উত্তর কোরিয়ায় ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন করে ঝালাই করা এবং উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বন্ধন জোরালো করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য। সোমবার (৮ জুন) মধ্যাহ্নে চীনা প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে অবতরণ করে বলে নিশ্চিত করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া।
চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, পিয়ংইয়ং বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিউয়ান বিমান থেকে নেমে এলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও তার স্ত্রী রি সল জু করতালির মাধ্যমে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। উত্তর কোরিয়ার শিশুরা এ সময় চীনা প্রেসিডেন্টকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। শি জিনপিংয়ের আগমন উপলক্ষে পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান প্রধান সড়কগুলো চীনের জাতীয় পতাকা এবং শি জিনপিংয়ের বিশাল প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয়।
চলতি বছরে এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম বিদেশ সফর। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই বেইজিংয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পৃথকভাবে আতিথেয়তা দেওয়ার পর তিনি উত্তর কোরিয়া সফরে এলেন। এই সফরের সময়কাল বিশ্বরাজনীতিতে চীনের বহুমুখী ও বৈশ্বিক ‘পাওয়ার ব্রোকার’ বা শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
সফরের প্রাক্কালে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রথাগত চিঠিতে শি জিনপিং লিখেছেন, সময় যতই পরিবর্তিত হোক বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির যতই বিবর্তন ঘটুক না কেন, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব অবিচ্ছেদ্য, চিরস্থায়ী এবং প্রতিনিয়ত তা নতুন প্রাণশক্তিতে বিকিরিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিম জং উন ও পুতিনের মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছালেও, উত্তর কোরিয়ার জন্য চীন যে এখনো সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক লাইফলাইন এবং প্রধান কূটনৈতিক অংশীদার— শি-র এই সফর তারই এক জোরালো স্মারক। উত্তর কোরিয়াও মূলত চীন ও রাশিয়ার মধ্যে এক ধরণের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে উভয়পক্ষ থেকেই সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা যায়।
শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং পৌঁছানোর ঠিক এক দিন আগে উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যম জানায়, কিম জং উন দেশটির একটি প্রধান সামরিক কারখানা পরিদর্শন করেছেন এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে ব্রিফিং নিয়েছেন। এর আগের সপ্তাহে কিম অস্ত্র তৈরির উপযোগী পারমাণবিক উপাদানের একটি নতুন প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে দেশের পারমাণবিক শক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
এই সফরটি চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার ১৯৬১ সালের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তির ৬৫তম বার্ষিকীর সাথে মিলে গেছে, যা চীনের একমাত্র সক্রিয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি।
শি জিনপিংয়ের এই সফর নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার বিভেদ আরও বাড়ছে। তবে আমাদের অবশ্যই সংলাপের পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উত্তর কোরিয়ার সাথে পুনরায় উচ্চপর্যায়ের কূটনীতি শুরু করতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। গত মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় শি জিনপিং ও ট্রাম্পের মধ্যে কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতি এবং উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিকেন্দ্রীকরণ করার যৌথ লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।