যমুনার থাবায় বিলীন ঘরবাড়ি-ফসলি জমি, সিরাজগঞ্জে ভাঙনের আতঙ্কে দীর্ঘশ্বাস

রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ

সারাদেশ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর তীব্র স্রোতে যমুনা নদী আবারও তার ভয়াল রূপে ফিরে এসেছে। সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর,

2026-06-09T19:29:45+00:00
2026-06-09T19:29:45+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
সারাদেশ
যমুনার থাবায় বিলীন ঘরবাড়ি-ফসলি জমি, সিরাজগঞ্জে ভাঙনের আতঙ্কে দীর্ঘশ্বাস
রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ৭:২৯ পিএম   (ভিজিট : ৫)
নদীর গর্ভে হারিয়ে যাওয়া বাড়ি দেখাচ্ছেন নারী। ছবি : সময়ের আলো
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর তীব্র স্রোতে যমুনা নদী আবারও তার ভয়াল রূপে ফিরে এসেছে। সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে নদীপাড়ের মানুষের অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস।

মঙ্গলবার (৯ জুন) সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চৌহালীর চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের একমাত্র সম্বল ছিল একটি ছোট্ট বসতঘর। গত ৪ জুন রাতে সেই শেষ আশ্রয়টুকুও যমুনার পেটে চলে গেছে। সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে চৌহালী উপজেলার অন্তত ৬ থেকে ৭টি গ্রামের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা এক নিমিষেই নদীগর্ভে চলে গেছে।

চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছে।


চরকানালিয়া গ্রামের আব্দুল মানিকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে নদীভাঙনের নির্মম ইতিহাস। এক সময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন তিনি। যমুনার ধারাবাহিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন তার হাতে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে মানিক বলেন, বারবার ঘর করেছি, বারবার নদী নিয়ে গেছে। আমরা আর কোনো সাহায্য চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম।

একই আকুতি চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিসেরও। তিনি বলেন, আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন তো থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হতো। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারেন না বলে জানান ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সাবিয়া বেগম, যিনি আগেই নিজের বসতভিটা হারিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন চরম হুমকির মুখে।

শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

নাটুয়ারপাড়ার কৃষক সেরু শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ জানান, যমুনার পানি ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় বছরের পর বছর এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাওয়াকোলা চরের কৃষক বাদশা শেখ আক্ষেপ করে বলেন, সারাবছর কষ্ট করে চাষাবাদ করি, কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেবো, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও তা এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো সরকারি পরিকল্পনা আপাতত নেই।

তবে সরকারি এই সনাতন ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। তাদের দাবি, প্রতিবছর ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকা হারানোর এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, আধুনিক ও কার্যকর নদীতীর রক্ষা প্রকল্প। যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে আব্দুল মানিকের চোখে এখনও একটুখানি স্বপ্ন—হারানো জমি হয়ত আর ফিরবে না, কিন্তু একটি স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত আগামী প্রজন্মকে আর ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক নিয়ে বড় হতে হবে না।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   যমুনার  ঘরবাড়ি  ফসলি জমি  সিরাজগঞ্জ  ভাঙন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: