টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতি ও অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টার পর অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে প্রকল্পের ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫২৬ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের এই প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা। প্রকল্পের আওতায় কালিহাতী উপজেলার পারখী ইউনিয়নের ভিয়াইল সংলগ্ন কুমর্সী (কুমরী) বিল থেকে গোয়ারিয়ার খোরশেদ ডাক্তারের জমি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কথা ছিল।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে কাজের মেয়াদ শুরু হয়ে ১০ জুন ২০২৬ তারিখে শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত ১০ মে কালিহাতীর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খায়রুল ইসলাম প্রথম দফায় এবং পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান মতিন দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। তবে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই গত ২২ জুন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি কাজটি সমাপ্ত ঘোষণা করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকদের ভোগান্তি কমানোর উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও এটি সুফলের চেয়ে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বহুগুণ। ১ কিলোমিটার খালের মধ্যে প্রায় ১০০ মিটার অংশ মোটেই খনন করা হয়নি। এছাড়া ভিয়াইলের কুমর্সী বিলের মূল প্রান্ত থেকে খালের সংযোগ নিশ্চিত না করেই কাজ শেষ করায় বিল থেকে খালে পানি প্রবাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিডিউল অনুযায়ী খালটি ২৫ থেকে ৪৫ ফুট প্রশস্ত এবং ১১ থেকে ১৮ ফুট গভীর করার কথা থাকলেও অনেক স্থানে সরু ড্রেনের মতো করে সামান্য মাটি কাটা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক পানি চলাচলের নল (চুংগী) নির্মাণ করা হয়নি। খালের দুই পাড়ে অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়ার কারণে পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলি জমি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবুজায়নের অংশ হিসেবে নিম্নমানের চারা রোপণ করায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় তা গবাদিপশুর পেটে গেছে। এছাড়া জনস্বার্থে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তথ্যসংবলিত কোনো সাইনবোর্ড প্রকল্প এলাকায় ঝুলানো হয়নি।
জালিয়াতি ও বিল আটকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, খালের খননকাজ শেষ না করেই তড়িঘড়ি করে পুরো প্রাক্কলিত অর্থ উত্তোলনের জন্য ভুয়া ও কাগুজে মাস্টাররোল বিল-ভাউচার জমা দিয়েছিল প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। তবে তৎকালীন ইউএনও মো. খায়রুল ইসলাম সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে কাজের খারাপ মান দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সম্পূর্ণ বিল প্রদানে বাধা দিয়ে তা আটকে দেন। পরবর্তীতে অনিয়মের অংশ হিসেবে উদ্বৃত্ত ও অসংগতিপূর্ণ ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫২৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, পারখী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন এই প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিতে অন্যান্য সদস্য হিসেবে ছিলেন নুর জাহান, রোজিনা ইয়াসমিন, জাহানারা খাতুন, বিএনপি নেতা মো. এমদাদুল হক মিয়া এবং পারখী মুনির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার চন্দ।
সকল অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। খালের পাশের জমি মালিকরা কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও সবার সহযোগিতায় কাজ শেষ করা হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পে এ ধরনের নয়ছয় ও সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা অনতিবিলম্বে পুরো বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/আতা