বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহতের পর স্কুলের সামনে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক সামলাচ্ছেন মমতাজ

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

সকালের ব্যস্ত সময়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে একের পর এক ছুটে যাচ্ছে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান। এর মাঝেই হাতে একটি লাল পতাকা

2026-09-16T15:07:51+00:00
2026-09-16T15:07:51+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহতের পর স্কুলের সামনে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক সামলাচ্ছেন মমতাজ
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০৭ পিএম 
বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহতের পর স্কুলের সামনে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক সামলাচ্ছেন মমতাজ। ছবি : সময়ের আলো
সকালের ব্যস্ত সময়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে একের পর এক ছুটে যাচ্ছে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান। এর মাঝেই হাতে একটি লাল পতাকা ও একটি লাঠি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন এক মধ্যবয়সী মানুষ। দূর থেকে আসা যানবাহন থামিয়ে একদল স্কুলপড়ুয়া শিশুকে নিরাপদে রাস্তা পার করে দিচ্ছেন তিনি। দায়িত্বটি কোনো ট্রাফিক পুলিশের নয়, নয় কোনো সরকারি কর্মচারীরও। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা মো. মমতাজ।

মাত্র কয়েক দিন আগেই এখানেই বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে দশ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ঈশা দাশ। সেই মৃত্যুই যেন নাড়া দিয়েছে মমতাজের বিবেককে। তাই নিজের সংসার, কাজ আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে গত দুই দিন ধরে তিনি স্বেচ্ছায় স্কুলের সামনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, ঈশাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়— এই ভাবনা থেকেই মমতাজ রাস্তায় নেমেছেন।

গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে সাতকানিয়ার মিঠাদিঘী এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে স্টার লাইন পরিবহনের একটি বাসের চাপায় গুরুতর আহত হয় ঈশা দাশ (১০)। সে উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দাশপাড়া এলাকার সুনীল কান্তি দাশের মেয়ে এবং ছদাহা কেয়াফাত উল্লাহ্ কবির আহমদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

স্থানীয়রা জানান, স্কুল শেষে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির বাসটি ঈশাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়।

ঈশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো এলাকা। সহপাঠীদের চোখে ছিল আতঙ্ক, অভিভাবকদের মনে ছিল শঙ্কা— পরের শিকার যদি আমার সন্তান হয়!

ঈশার মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে প্রায় দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন। তাদের একটাই দাবি— এই সড়কে আর কোনো শিশুর প্রাণ যেন না যায়।

অবরোধের পর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে স্পিডব্রেকার ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের আশ্বাসের পর স্কুলের সামনে স্পিডব্রেকার ও জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জানা যায়, ভোরের কাজ শেষ করে প্রতিদিন স্কুল শুরু হওয়ার আগেই চলে আসেন মমতাজ। হাতে একটি লাল পতাকা ও একটি লাঠি। কখনো হাত তুলে বাস থামান, কখনো ট্রাকের গতি কমান, আবার কখনো ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের রাস্তা পার করিয়ে দেন। স্কুল ছুটির সময়ও একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন মহাসড়কে।

মমতাজ বলেন, ঈশা নামের ছোট্ট মেয়েটার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে খুব খারাপ লাগছে। প্রতিদিন দেখি এই রাস্তা দিয়ে অসংখ্য ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়। যদি আমার একটু সময় দেওয়ায় একটি শিশুর জীবনও বাঁচে, তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমি চাই না আর কোনো পরিবার ঈশার পরিবারের মতো সন্তান হারানোর কষ্ট পাক। তাই নিজের দায়িত্ব মনে করেই এখানে দাঁড়িয়ে শিশুদের রাস্তা পার করে দিচ্ছি।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোনো শিশুকে একা রাস্তা পার হতে দেখলেই তিনি ছুটে যান। যানবাহন থামিয়ে তারপর শিশুদের পার করান। অনেক চালকও তার সংকেত মেনে গাড়ি থামিয়ে দেন।

স্থানীয়দের মতে, মমতাজ যা করছেন, সেটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে হওয়াটা একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও তুলে দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল কাদের বলেন, মমতাজ ভাই নিজের কোনো স্বার্থ ছাড়া সকাল-বিকাল দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের রাস্তা পার করাচ্ছেন। এটা সত্যিই মানবিক কাজ। কিন্তু এই দায়িত্ব তো সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার। একজন সাধারণ মানুষ কতদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন? স্থায়ীভাবে ট্রাফিক পুলিশ, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

আরেক অভিভাবক রিনা দাশ বলেন, আগে প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতাম। এখন মমতাজ ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা সাহস পাই। তবে আমরা চাই না এই দায়িত্ব একজন সাধারণ মানুষের ওপর থাকুক; সরকার স্থায়ী ব্যবস্থা করুক।

তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই ব্যস্ত মহাসড়ক পার হয়। অথচ সেখানে এতদিন ছিল না জেব্রা ক্রসিং ও কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এখন স্পিডব্রেকার ও জেব্রা ক্রসিং করা হলেও নিয়মিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও চালকদের সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   বাসচাপা  শিক্ষার্থী নিহত  স্কুলের সামনে  স্বেচ্ছায় ট্রাফিক  মমতাজ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: