গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর একটি শাখা। নদীটি খুব বড় নয়, দৈর্ঘ্যে মাত্র ১২০ ফুটের মতো।
কিন্তু এই ছোট্ট নদীটিই বছরের পর বছর ধরে দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনকে বিভক্ত করে রেখেছে। একপাশে বসতি, অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র আর জীবিকার পথ।
নদীর এপাড়-ওপাড়ের দূরত্ব হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার হিসাব সেখানে অনেক দীর্ঘ। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের কথা চিন্তা করে ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন।
পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ এবং তৎকালীন সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। সাঁকো নির্মাণের পর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর, জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। কৃষকরা তুলনামূলক দ্রুত ফসল বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়ীদের যাতায়াত বাড়ে, আর স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগামী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চলাচলেও নতুন গতি আসে।
সাঁকো তৈরির পর থেকে প্রতি বছরই ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বরাদ্দ থেকে চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ নিজে তদারকি করে সাঁকোটি মেরামত ও সংস্কার করিয়ে আসছেন। কোনো বছর নতুন কাঠ লাগানো হয়েছে, কোনো বছর বাঁশ বদলানো হয়েছে, কোনো বছর পুরো একটি অংশ নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে।
কিন্তু প্রতি বছর মেরামত করেও এই সাঁকোকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এটি কাঠ আর বাঁশের তৈরি একটি অস্থায়ী কাঠামো যার ওপর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভার পড়ছে। ২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সাঁকোটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে কয়েক মাস চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। সেবারও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হয়।
কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সেই একই চিত্র। ভাঙন, মেরামত, আবার ভাঙন। এই চক্রের মধ্যে বন্দি হয়ে আছে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন। এ বছর বর্ষার প্রাক্কালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে বেড়েছে নদীর পানি, অন্যদিকে ভেসে আসছে স্তূপ স্তূপ কচুরিপানা। সেই কচুরিপানা সাঁকোর নিচে আটকে জমে উঠছে। কচুরিপানা আর পানির চাপে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ বেঁকে যাচ্ছে, দেবে যাচ্ছে। কোথাও কাঠ নরম হয়ে পচে গেছে, কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে।
পুরো সাঁকোটিই এখন ভয়ংকরভাবে নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এই পরিস্থিতিতে গ্রামবাসী নিজেরাই হাত লাগিয়েছেন। স্বেচ্ছাশ্রমে কেউ বাঁশ দিয়ে ঠেলে কচুরিপানা সরাচ্ছেন, কেউ নদীতে নেমে হাত দিয়ে টেনে তুলছেন। কিন্তু প্রতিদিন নতুন করে কচুরিপানা এসে জমছে। গ্রামবাসীর এই লড়াই যেন শেষ হওয়ার নয়।
ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট তিস্তার এই শাখা নদী। বছরের পর বছর মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। কাঠের সাঁকো দিয়ে সাময়িকভাবে যাতায়াত সম্ভব হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারিভাবে একটি সেতু নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। তিস্তার এই শাখা নদীটি চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২০১৭ সালে জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজ উদ্যোগে এখানে কাঠের সাঁকো নির্মাণ করি।
এরপর থেকে প্রতি বছরই ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ দিয়ে সাঁকোটি সংস্কার করে আসছি। কখনো আংশিক মেরামত, কখনো পুরোপুরি নতুন করে নির্মাণ করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর বন্যা আর কচুরিপানার চাপে সাঁকোটির অবস্থা আবার নাজুক হয়ে পড়ে। এটি শুধু একটি চলাচলের পথ নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী সবাই এই সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কাঠের সাঁকো দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই অনুমোদন মিলবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের কষ্ট লাঘব হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
ইতিমধ্যে সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
/এসএকে