ফিফা বিশ্বকাপের ২২টি আসর পেরিয়ে ফুটবল বিশ্ব যেন সম্ভাব্য সব রোমাঞ্চই দেখে ফেলেছে।
ফাইনালে একই খেলোয়াড়ের উভয় দলের হয়ে গোল করা, চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলারের জালের ঠিকানা খুঁজে নেওয়া, দুই ভাইয়ের একে অন্যের মুখোমুখি হওয়া কিংবা একই ফুটবলারের ভিন্ন দুটি দেশের হয়ে ফাইনাল খেলার মতো অবিশ্বাস্য সব ঘটনার সাক্ষী বিশ্ববাসী।
এতসব নাটকীয়তার পরও বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে একটি রেকর্ড এখনও অক্ষত রয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো বিদেশি কোচের অধীনে কোনো দেশ বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।
তবে বিদেশি কোচরা যে দল নিয়ে একদমই সফল হননি, তা কিন্তু নয়। ২০০২ সালে গাস হিডিঙ্ক সহ-আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়াকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন।
লুই ফিলিপ স্কলারি ও রবার্তো মার্তিনেস যথাক্রমে ২০০৬ সালে পর্তুগাল এবং ২০১৮ সালে বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালের মঞ্চে নিয়ে যান।
এর আগে ১৯৫৮ সালে ইংলিশ কোচ জর্জ রেনর সুইডেনকে তাদের ঘরের মাঠে ফাইনালে তুলেছিলেন, যদিও পেলের ব্রাজিলের কাছে সেবার হারতে হয়েছিল তাদের।
১৯৭৮ সালেও ডাচদের ফাইনালে তুলেছিলেন অস্ট্রিয়ান কোচ আর্নস্ট হ্যাপেল, কিন্তু স্বাগতিক আর্জেন্টিনার কাছে হেরে সেবারও স্বপ্নভঙ্গ হয় নেদারল্যান্ডসের।
তবে ২০২৬ সালের আসন্ন আসরে ৯৬ বছরের এই পুরোনো রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার এক প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে ২৬টি দেশের ডাগআউটেই থাকছেন বিদেশি কোচ, যা মোট দলের প্রায় ৫৪ শতাংশ।
গত বিশ্বকাপের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। এই ২৬টি দেশের মধ্যে ১০টি দেশই রয়েছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ২৫-এর মধ্যে, যাদের মধ্যে টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট থেকে শুরু করে যেকোনো মুহূর্তে চমক তৈরি করা দলও রয়েছে।
সহ-আয়োজক কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের জন্য বিদেশি কোচের ওপরই ভরসা রেখেছে। ২০২৪ সালে কানাডার দায়িত্ব নেওয়া আমেরিকান কোচ জেসি মার্শ এবার ইতিহাস গড়তে মরিয়া।
অন্যদিকে একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়া আর্জেন্টাইন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো বিশ্বাস করেন, তার দলের বিশ্বমঞ্চে লড়াই করার মতো যথেষ্ট প্রতিভা রয়েছে।
এ ছাড়া ল্যাটিন আমেরিকার বাছাইপর্বে দ্বিতীয় হওয়া ইকুয়েডর আসছে আর্জেন্টাইন কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের অধীনে। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা অস্ট্রিয়াকে পথ দেখাবেন জার্মান কোচ রাল্ফ রাংনিক।
আর ২০০২ সালের ব্রোঞ্জজয়ী তুরস্কের ডাগআউটে থাকছেন ইতালিয়ান ভিনসেনজো মন্তেল্লা।
বিশ্বকাপের দুবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের দায়িত্বে আছেন অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। ‘এল লোকো’ খ্যাত এই কোচ এর আগে ২০০২ সালে নিজ দেশ আর্জেন্টিনা এবং আট বছর পর চিলির হয়ে বিশ্বকাপ সামলেছেন।
এ ছাড়া উরুগুয়ের ঠিক ওপরে ১৩ নম্বরে থাকা কলম্বিয়ার ডাগআউটেও থাকছেন আরেক আর্জেন্টাইন নেস্টর লরেঞ্জো। যিনি ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সময় হোসে পেকারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
এদিকে ২০১৮ সালের ব্রোঞ্জজয়ী বেলজিয়াম এবার ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়ার অধীনে নতুন এক শিরোপা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিলের লক্ষ্য এবার হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়। র্যাঙ্কিংয়ের ছয়ে থাকা সেলেসাওরা তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি কোচের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে তিনি আর কেউ নন, ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি।
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সফলতম এই কোচ কি পারবেন ব্রাজিলকে তাদের বহুকাক্সিক্ষত ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে?
র্যাঙ্কিংয়ের পাঁচে থাকা পর্তুগাল আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ না জেতা দলগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে (সাত নম্বরে থাকা নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে)। দলটির কোচ রবার্তো মার্তিনেস, যিনি আট বছর আগে বেলজিয়ামকে পদক জিতিয়েছিলেন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রুবেন দিয়াস, ব্রুনো ফার্নান্দেস ও জোয়াও নেভেসদের মতো তারকাদের নিয়ে তিনি এবার ইতিহাস গড়তে চান। অন্যদিকে বিদেশি কোচের অধীনে থাকা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ওপরে (৪র্থ স্থানে) রয়েছে ইংল্যান্ড।
২০২৪ সালের অক্টোবরে থমাস টুখেলকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয় থ্রি লায়ন্সরা, যিনি দলটির ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় বিদেশি কোচ। গত কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টের একদম কাছাকাছি গিয়েও ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ এবার টুখেলের হাত ধরে ঘোচাতে চায় ইংলিশরা।
তবে ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলছে। বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ তিন দল ফ্রান্স, স্পেন এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সবাই ঘরের কোচের অধীনেই মাঠে নামবে। ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং চালু হওয়ার পর থেকে মাত্র তিনবার র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ তিনের বাইরের কোনো দল বিশ্বকাপ জিতেছে।
১৯৯৮ সালে ১৮তম স্থানে থাকা ফ্রান্স, ২০০৬ সালে ১৩তম স্থানে থাকা ইতালি এবং ২০১৮ সালে ৭ম স্থানে থাকা ফ্রান্স। এখন দেখার বিষয়, টানা ২৩তম আসরের মতো কি চেনা ইতিহাসই পুনরাবৃত্তি ঘটবে, নাকি কোনো বিদেশি কোচের হাত ধরে ফুটবল বিশ্ব পাবে এক নতুন ইতিহাস?
/এসএকে