অনেক সময় ক্রিকেট শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়, হয়ে ওঠে অপেক্ষা, অবহেলা আর প্রত্যাবর্তনের গল্প। যে গল্পে থাকে হতাশা, প্রশ্ন আর নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার অদম্য তাগিদ। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ইনিংসটি ছিল তেমনই এক গল্পের পরিণতি।
চার বছর ধরে জাতীয় দলের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্রিকেটার ফিরে এসে ব্যাট হাতে দিলেন নিজের জবাব, আর সেই জবাব ছিল ৭০ বলে অপরাজিত ৮৬ রানের এক অসাধারণ ইনিংস, সঙ্গে ১০ ওভারে ৩৬ রানে দুটি উইকেট।
কিছুদিন আগেও জাতীয় দলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কা সিরিজের দল ঘোষণার সময় সাবেক প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু মন্তব্য করেছিলেন, মেহেদী হাসান মিরাজ দলে থাকলে মোসাদ্দেকের ফেরা কঠিন।
পরে অবশ্য সেই মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেছিলেন তিনি। কিন্তু মাঠই শেষ কথা বলে। আর সেই মাঠেই অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষেক্ষনিজের ব্যাট দিয়ে জবাব দিলেন মোসাদ্দেক।
শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। দলীয় ১০ রানে ফিরে যান সাইফ হাসান।
তবে এরপর দ্বিতীয় উইকেটে তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত ৯৬ রানের জুটি গড়ে ইনিংসের ভিত তৈরি করেন। তানজিদ ৫৪ রান করে ফিরলেও বড় ইনিংসের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
এরপর শান্তও দারুণ ছন্দে ব্যাট করতে থাকেন। তবে বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২৫.৩ ওভারে। দলীয় ১৪০ রানে নাজমুল হোসেন শান্ত আউট হওয়ার পর ব্যাট হাতে নামেন মোসাদ্দেক।
তখনও ম্যাচ পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। একদিকে অজিদের বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ, অন্যদিকে বড় সংগ্রহ গড়ার চাপ। সেই পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলেন তিনি।
নিজের প্রথম বাউন্ডারিটি আসে ম্যাট রেনশর বলে কাট শটে। যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা অপেক্ষার প্রতীক হয়ে ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে সেই শট। এরপর ধীরে ধীরে ইনিংস গড়তে থাকেন তিনি।
পঞ্চম উইকেটে তাওহীদ হৃদয়ের সঙ্গে গড়েন ৭৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তবে ভাগ্যের সহায়তাও পেয়েছিলেন মোসাদ্দেক। ব্যক্তিগত ২১ রানে রেনশর বলে লং-অনে সহজ ক্যাচ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া করেন কুপার কনোলি। জীবন পাওয়ার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
এরপর যত সময় গড়িয়েছে, ততই আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন মোসাদ্দেক। স্ট্রাইক ঘুরিয়েছেন, ফাঁকা জায়গায় বল পাঠিয়েছেন, সুযোগ পেলেই খেলেছেন আক্রমণাত্মক শট। ৪৯ বলে তুলে নেন ফিফটি। এরপর শেষের দিকে তার ব্যাটেই আসে বাংলাদেশের ইনিংসের গতি।
হৃদয় ফিরে যাওয়ার পরও দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এই অলরাউন্ডার। শেষ পর্যন্ত ৭০ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৮৬ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি। তার ইনিংসেই বাংলাদেশ ৮ উইকেটে তোলে ২৮৪ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ ওয়ানডে দলীয় সংগ্রহ।
মোসাদ্দেকের ইনিংসের মূল্য আরও বেশি কারণ এটি এসেছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর। জাতীয় দলের হয়ে তার অভিষেক হয়েছিল ২০১৬ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরেই। সেদিনও খেলেছিলেন অপরাজিত ৪৫ রানের ইনিংস।
এরপর সম্ভাবনার ঝলক দেখালেও কখনো নিয়মিত হতে পারেননি। সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন ২০২২ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে। তারপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর।
এই সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করেও জাতীয় দলে জায়গা পাননি। অথচ শেষ পাঁচ ইনিংসের তিনটিতে ব্যাটিংয়ের সুযোগই পাননি তিনি।
তারপরও দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। সেই আক্ষেপ, সেই অপেক্ষা, সেই প্রশ্নের উত্তর যেন এক ইনিংসেই দিয়ে দিলেন মোসাদ্দেক। ৪৪ ওয়ানডে ম্যাচের ক্যারিয়ারে এটি তার চতুর্থ ফিফটি।
এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অপরাজিত ৫২, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১ এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫০ রান করেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই ৮৬ রান নিঃসন্দেহে তার সেরা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসগুলোর একটি।
/এসএকে