বাজেট ব্যপারটা অনেকেই বোঝেন না। এত টাকার হিসাব, আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্র বুঝতে গেলে অনেকেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। চলুন, সহজভাবে জেনে নিই, বাজেট জিনিসটা আসলে কী?
ধরুন, মাসের প্রায় শেষের দিক। আপনার পকেটে আছে মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ, সামনে আরও পাঁচ দিন বা এক সপ্তাহ বাকি। এখন যদি আপনি হঠাৎ করে বন্ধুদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে ৪০০ টাকা উড়িয়ে দেন, তাহলে পরের পাঁচ দিন কীভাবে চলবেন?
এমন অবস্থায় আপনি কী করেন? নিশ্চয়ই হিসাব করেন। কত টাকা আছে, কত দিন চলতে হবে, কোন খরচটা জরুরি, কোনটা পরে করা যাবে- এসব ঠিক করেন। অর্থাৎ, আপনি একটা ছোট্ট বাজেট বানিয়ে ফেলেন।
মজার ব্যাপার হলো, রাষ্ট্রও ঠিক এই কাজটাই করে। পার্থক্য শুধু এটুকু- আপনি নিজের পরিবারের জন্য করেন, সরকার করে পুরো দেশের জন্য।
মনে করুন, জাকির সাহেবের পরিবারে মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে তাকে বাসাভাড়া, সন্তানের স্কুলের ফি, বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে, বাজার করতে হবে এবং চিকিৎসার খরচ রাখতে হবে। এখন যদি তিনি ৬০ হাজার টাকা খরচের পরিকল্পনা করেন, তাহলে কী হবে? হয় তাকে ঋণ করতে হবে, নয়ত কারও কাছ থেকে ধার নিতে হবে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। সরকারেরও আয় আছে। যেমন- কর, ভ্যাট, আমদানি-রফতানি শুল্ক ইত্যাদি। আবার সরকারের খরচও আছে। রাস্তা বানানো, সেতু নির্মাণ, স্কুল-কলেজ পরিচালনা, হাসপাতাল চালানো, সরকারি কর্মচারীদের বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এমন নানান খাতে সরকার ব্যয় করে থাকে। এই আয় ও ব্যয়ের হিসাব মিলিয়েই তৈরি হয় বাজেট।
কিন্তু বাজেট ঘোষণা হলেই মানুষ এত আগ্রহী হয় কেন? কারণ, বাজেটের প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে। মনে করুন, সরকার মোবাইল ফোন আমদানির ওপর কর বাড়িয়ে দিল। তাহলে কী হবে? মোবাইলের দাম বেড়ে যাবে। আবার যদি ল্যাপটপ বা ইন্টারনেট সেবার ওপর কর কমানো হয়, তাহলে সেই খাতে খরচ কিছুটা কমতে পারে। অর্থাৎ, বাজেটের একটা সিদ্ধান্ত আপনার পকেটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, একটা গ্রামে ১০০ জন মানুষ আছে। সেখানে একটা স্কুল বানাতে হবে, একটা রাস্তা মেরামত করতে হবে এবং একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রাখতে হবে। এই কাজগুলোর জন্য টাকা লাগবে। এখন যদি সবাই একটু একটু করে টাকা দেয়, তাহলে কাজগুলো করা সম্ভব। রাষ্ট্রে করের ধারণাটাও অনেকটা এমন। নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত কর দিয়েই রাষ্ট্র বিভিন্ন সেবা দেয়।
অবশ্য, বাস্তবতা আরও জটিল। অনেক সময় সরকারের আয় খরচের তুলনায় কম হয়। তখন সরকার ঋণ নেয়। এটাকে বলা হয় বাজেট ঘাটতি। কিন্তু, বাজেট ঘাটতি মানেই কী নেতিবাচক? সবসময় না।
ধরুন, আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটা দোকান দিলেন। ঋণের টাকা খরচ হলো ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে দোকান থেকে আয় হবে। তাহলে সেই ঋণকে খারাপ বলা যাবে না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ব্যপারটা এক। যদি ঋণের টাকা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা হয়, যেমন- বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিল্প বা শিক্ষা খাতে, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থনীতি বড় হতে পারে। কিন্তু ঋণের টাকা যদি অপচয় হয়, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন তৈরি হতে পারে, বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব কোন খাতে দেওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর একেক দেশের জন্য একেক রকম। সাধারণভাবে অর্থনীতিবিদরা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি সুফল দেয়। কেননা, একটি দেশ যত বেশি দক্ষ ও সুস্থ জনশক্তি তৈরি করতে পারে, তার অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হয়।
আসলে, দেশের হাতে কত টাকা আছে, সেই টাকা কোথায় খরচ হবে এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হবে- সহজ কথায় এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই বাজেট।
/মহু