আমাদের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা সহজ ছিল না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শান্তিরক্ষায় ভবিষ্যতে আমাদের মিশনগুলো হতে হবে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই লক্ষ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে পর্যায়ক্রমিকভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বুধবার (১০ জুন) সকালে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে শহীদদের এই আত্মদান, যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী মানুষের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তাদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে— শুধু মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বই নয়; জাতিসংঘের পতাকাতলে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো মূল্যে শান্তিরক্ষায় বদ্ধপরিকর।
কিন্তু এই পথ বন্ধুর ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা সহজ ছিল না। শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এই মহান ও মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাদের।’
শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে একটি প্রতিকূল পরিবেশে আপনারা নিষ্ঠা, সাহস ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আপনাদের এই অবদানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।’
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে দেশের সামরিক বাহিনীর অবদান তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে শহীদ হওয়া শান্তিরক্ষীদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ২ লাখের বেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশের প্রায় ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশনে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৮৬০ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টি শান্তিরক্ষা মিশনে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্য সাহসের সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বিশ্বশান্তি রক্ষায় আমাদের এই গৌরবের ইতিহাস এক দিনে রচিত হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটি আস্থা ও নির্ভরতার নাম।’
সশস্ত্র বাহিনী একটি দেশের স্বাধীনতা, সম্মান ও সাহসের প্রতীক জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সেনাবাহিনীর একজন মেজর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই গৌরব ও অহংকার আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনন্ত প্রেরণার উৎস। তাই এই গৌরব যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেটি রক্ষা করা সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্য।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে কিছু অপতৎপরতা কখনও কখনও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কারণ হয়েছে। দেশ-বিদেশে সশস্ত্র বাহিনীর ইমেজ বিনষ্ট করতে নানা তৎপরতাও বিদ্যমান ছিল। তবে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এরপরও বিভিন্ন সময়ে নানা রকম ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্য বিনষ্টের তৎপরতা চলেছে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সর্বগ্রাসী আঘাতটি এসেছিল। সেই আঘাতের ফলে বাংলাদেশে কী ঘটেছিল সেটি আমাদের সবার জানা। তাই ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রধান বার্তাটি হলো প্রোফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অব কমান্ড ছাড়া সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধুই অতীত চর্চা নয়, বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সামনে স্বমহিমায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন অথবা সরকারে বা জনপ্রশাসনে রয়েছেন, আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা দেশে বা বিদেশে যেখানে যে দায়িত্ব পালন করছি, সেই দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করাই হোক আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার।’
আরও পড়ুন
বর্তমান বিশ্ব এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জগুলো এখন অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায়।’
বাংলাদেশ সব সময় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদার নীতিতে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাই আমাদের ভবিষ্যৎ মিশনগুলো হতে হবে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনী আধুনিক করতে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের প্রতি যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, আমরা তা বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ যেকোনো আগ্রাসন ও সংঘাতের বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলতে বহুপক্ষীয় কূটনীতি ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা তাদের আন্তরিকতা, কর্তব্যবোধ এবং পেশাদারিত্বের গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শান্তিরক্ষা মিশনের প্রত্যেক সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের প্রতিনিধি, দেশের মান-সম্মানের বাহক। আশা করি, আগামী দিনে যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালন করতে বিভিন্ন দেশে যাবেন, তারা একইভাবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সুনাম সমুন্নত রাখবেন।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানসহ সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ ১০ জুন এটি পালিত হচ্ছে।