জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। বুধবার (১০ জুন) লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে প্রতিরোধমূলক ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রধানমন্ত্রীর জন্য তারকাচিহ্নিত পাঁচটি প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারকাচিহ্নিত তিনটি এবং বিভিন্ন সংসদ সদস্যের এ–সংক্রান্ত সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।
সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জেলা প্রশাসক সম্মেলনে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা পরিহার করে দ্রুত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, মেধা ও দক্ষতাকেই একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে অনুসরণ করা হবে। তিনি আরও জানান, সরকারি সেবা প্রদান ব্যবস্থা সময়োপযোগী, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে ডিজিটাল রূপান্তর জোরদার করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমও চলবে।
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠে এলে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সম-উন্নয়নে বিশ্বাস করে। তিনি বলেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেভাবে উন্নয়ন সহযোগিতা পাবেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের এলাকাও একইভাবে সরকারের সহযোগিতা পাবে। ঈদের আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কিছু সহায়তা বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিনের কর্মসূচি, আগামী অর্থবছরের পরিকল্পনা এবং পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই দর্শন সামনে রেখে নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ক্ষুদ্র কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে পাঁচ জেলায় এ সেবা চালু হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী ভাতা কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
সরকার পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে শূন্য পদ পূরণের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তার মধ্যে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ দপ্তর ও সংস্থাসমূহে শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন লোক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাজেটের আগের দিন সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণ হবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
/ইউএমএইচ