এমবাপের উত্তরাধিকার আর ইতিহাসের হাতছানি

মেহেদী হাসান

খেলা

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ইতিহাস লেখার মঞ্চ। এখানে কিছু দল আসে অংশ নিতে, কিছু দল আসে স্বপ্ন

2026-06-11T03:04:56+00:00
2026-06-11T03:04:56+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
খেলা
এমবাপের উত্তরাধিকার আর ইতিহাসের হাতছানি
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৩:০৪ এএম   (ভিজিট : ৭)
কিলিয়ান এমবাপে। ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ইতিহাস লেখার মঞ্চ। এখানে কিছু দল আসে অংশ নিতে, কিছু দল আসে স্বপ্ন দেখতে, আর কিছু দল ইতিহাস গড়তে। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সকে দেখলে মনে হয়, এই দলটির সামনে শুধু শিরোপা জয়ের লক্ষ্যই নেই, আছে আরও বড় কিছু অর্জনের। আছে কোচ দিদিয়ের দেশমের বিদায়ি অধ্যায়কে মহাকাব্যে রূপ দেওয়ার সুযোগ, আছে কিলিয়ান এমবাপের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার আরেকটি ধাপ, আছে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার বিরল কীর্তি গড়ার সম্ভাবনা।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকতার আরেক নাম ফ্রান্স। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০২২ সালে ফাইনাল খেলেছে, ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলারদের বড় অংশই খেলছে এই দলের হয়ে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে যখন শক্তির হিসাব-নিকাশ চলছে, তখন ফ্রান্সকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ফ্রান্সের বর্তমান সাফল্যের গল্প বলতে গেলে শুরুতেই চলে আসে দিদিয়ের দেশমের নাম। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি শুধু একটি দল গড়েননি, তৈরি করেছেন একটি সংস্কৃতি। এমন একটি দল, যারা বড় মঞ্চে নিজেদের সেরাটা দিতে জানে।

দেশমের অর্জনের তালিকা এমনিতেই ঈর্ষণীয়। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সময় তিনি ছিলেন দলের অধিনায়ক। এরপর ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে দলকে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ফলে ব্রাজিলের মারিও জাগালো এবং জার্মানির বেকেনবাওয়ারের পর খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা তৃতীয় ব্যক্তি তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইতিমধ্যে ফরাসি ফুটবল মহলে জোর আলোচনা, তার উত্তরসূরি হতে পারেন আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদান। ফলে এই বিশ্বকাপই দেশমের শেষ বড় মঞ্চ। বিদায়ের আগে এরচেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে? আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চয়।

বিশ্ব ফুটবলে এখন অনেক শক্তিশালী দল আছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, ইউরোপীয় শক্তি ইংল্যান্ড, স্পেন কিংবা জার্মানি। কিন্তু স্কোয়াডের গভীরতা, প্রতিভার বৈচিত্র্য এবং ভারসাম্যের বিচারে ফ্রান্সকে অনেকেই এগিয়ে রাখছেন। তা ফরাসি আক্রমণভাগের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মাইকেল অলিসে, উসমান ডেম্বেলে, কিলিয়ান এমবাপে, দেজিরে দোয়ে, কোলো মুয়ানি, মার্কাস থুরামসহ একের পর এক তারকা। হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের নির্বাচিত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত বাজারমূল্য ৮২৫ মিলিয়ন ইউরোর কাছাকাছি। শুধু চারজন খেলোয়াড়, এমবাপে, ডেম্বেলে, অলিসে এবং দোয়ের বাজারমূল্যই প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো! তুলনামূলকভাবে ব্রাজিলের পুরো আক্রমণভাগের মূল্যও এর চেয়ে কম বলে ধারণা করা হয়। এটি শুধু অর্থের হিসাব নয়। এটি প্রতিভার গভীরতারও প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বকাপ মানেই যেন এমবাপের মঞ্চ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে করেছিলেন অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক। অথচ দলকে শিরোপা এনে দিতে পারেননি। বর্তমানে তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১২টি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোসøাব ক্লোজ করেছেন ১৬ গোল। অর্থাৎ রেকর্ড ছুঁতে এমবাপের প্রয়োজন মাত্র চারটি গোল। বয়স বিবেচনায় এই লক্ষ্য খুবই বাস্তবসম্মত। শুধু তাই নয়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করেছেন তিনি। ফর্ম, অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস- সবকিছুই এখন তার পক্ষে।

ফরাসির কিংবদন্তি অলিভার জিরাডের জাতীয় দলের সর্বোচ্চ ৫৭ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতেও তার প্রয়োজন মাত্র একটি গোল। তাই এই বিশ্বকাপ এমবাপের জন্য কেবল ট্রফি জয়ের মিশন নয়, উত্তরাধিকার নির্মাণেরও মঞ্চ। একসময় ডেম্বেলের ক্যারিয়ারকে ঘিরে প্রশ্ন ছিল চোট ও ধারাবাহিকতা নিয়ে। কিন্তু এখন তিনি অন্য এক ফুটবলার। চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী মৌসুমে তিনি ইউরোপের সবচেয়ে কার্যকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের একজন। প্রতি ৯০ মিনিটে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তার অবদান ১.৪, যা ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে শুধু হ্যারি কেইনের চেয়ে কম।

অন্যদিকে মাইকেল অলিসে যেন ফ্রান্সের নতুন সৃজনশীল শক্তি। চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ইউরোপের বড় লিগগুলোর মধ্যে যা সর্বোচ্চ। ইউরো ২০২৪-এর পর দেশম যখন কৌশল বদলান, তখন অলিসেকেই ৪-২-৩-১ ছকের কেন্দ্রে এনে বসান। সেই সিদ্ধান্তই ফ্রান্সের আক্রমণকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।

ফ্রান্সের সামনে এবার একাধিক ঐতিহাসিক অর্জনের সুযোগ। গত সাত বিশ্বকাপের মধ্যে চারবার ফাইনালে উঠেছে তারা। এবার ফাইনালে উঠতে পারলে টানা তিন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার বিরল কীর্তি গড়বে। এখন পর্যন্ত এই অর্জন আছে শুধু পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০) এবং ব্রাজিলের (১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২)। অর্থাৎ ফ্রান্স এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তারা শুধু একটি শিরোপার জন্য লড়ছে না; লড়ছে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের স্থান আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে দেখলে মনে হয়, এটি কেবল আরেকটি শক্তিশালী দল নয়- এটি অভিজ্ঞতা, প্রতিভা, ক্ষুধা এবং অসমাপ্ত গল্পের সমন্বয়ে গড়া এক ফুটবল শক্তিধর। একদিকে দেশমের বিদায়ি অধ্যায়, অন্যদিকে এমবাপের কিংবদন্তি হওয়ার পথচলা। সঙ্গে ডেম্বেলে, অলিসে, দোয়ে ও সালিবাদের উত্থান। সবমিলে ফ্রান্সের সামনে সুযোগ আছে এমন একটি গল্প লেখার, যা হয়তো বহু বছর ধরে ফুটবলপ্রেমীরা মনে রাখবে।

আর যদি জুলাইয়ের শেষ দিকে বিশ্বকাপ ট্রফিটি আবারও ফরাসিদের হাতে ওঠে, তা হলে সেটি শুধু একটি শিরোপা জয় হবে না। সেটি হবে এক যুগের পূর্ণতা, এক কিংবদন্তি কোচের মহিমান্বিত বিদায় এবং নতুন এক ফুটবল সাম্রাজ্যের ঘোষণাপত্র।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   এমবাপে  উত্তরাধিকার  ইতিহাস  হাতছানি 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: