অপূর্ণ স্বপ্নের শেষ অভিযানে রোনালদো

মেহেদী হাসান

খেলা

কাতারের সেই রাতটি এখনও ফুটবল বিশ্বের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আল থুমামা স্টেডিয়ামের আলো তখনও নিভে যায়নি, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চোখে

2026-06-11T04:18:30+00:00
2026-06-11T04:18:30+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
খেলা
অপূর্ণ স্বপ্নের শেষ অভিযানে রোনালদো
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৪:১৮ এএম   (ভিজিট : ১০)
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ছবি : সংগৃহীত
কাতারের সেই রাতটি এখনও ফুটবল বিশ্বের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। আল থুমামা স্টেডিয়ামের আলো তখনও নিভে যায়নি, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চোখে যেন অন্ধকার নেমে এসেছিল। মরক্কোর কাছে হেরে বিশ্বকাপ ২০২২ থেকে বিদায় নিয়েছিল পর্তুগাল, আর মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন দেশটির সর্বকালের সেরা ফুটবলার। সেই কান্না ছিল শুধু একটি ম্যাচ হারার নয়, ছিল একটি স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।

পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোনালদো লিখেছিলেন, ‘পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপ জেতাই ছিল আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন। ১৬ বছরে পাঁচটি বিশ্বকাপে আমি দেশের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। মাঠে আমার যা ছিল, সব রেখে এসেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই স্বপ্ন গতকাল শেষ হয়ে গেছে।’

কিন্তু সময় যেন রোনালদোর সেই ঘোষণাকে সত্যি হতে দেয়নি। ৪১ বছরে পা রাখার আগমুহূর্তে তিনি আবারও জায়গা পেয়েছেন পর্তুগালের ২০২৬ বিশ্বকাপ দলে। আর তাই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের সামনে খুলে গেছে শেষ সুযোগ, হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ২০২২ বিশ্বকাপে রোনালদো শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গেই লড়েননি, লড়েছেন নিজের সময়ের সঙ্গেও। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিশৃঙ্খল সমাপ্তির পর কাতারে গিয়েছিলেন সমালোচকদের জবাব দিতে এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় তাকে একাদশের বাইরে রাখেন কোচ ফার্নান্দো সান্তোস। তার পরিবর্তে খেলতে নেমে গনজালো রামোস হ্যাটট্রিক করে পর্তুগালকে ৬-১ গোলের বড় জয় এনে দেন। এরপরই শুরু হয় নানা গুঞ্জন। খবর বের হয়, বাদ পড়ার ক্ষোভে রোনালদো নাকি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। যদিও রোনালদো পরে লিখেছিলেন, ‘পর্তুগালের প্রতি আমার নিবেদন কখনো এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি। আমি সবসময় সবার লক্ষ্য পূরণের জন্য লড়াই করা একজন খেলোয়াড় ছিলাম। সতীর্থ কিংবা দেশের প্রতি কখনো পিঠ দেখাইনি।’

বিশ্বকাপের পর পর্তুগাল নতুন যুগে প্রবেশ করবে বলেই মনে হয়েছিল। ফার্নান্দো সান্তোসের বিদায়ের পর দায়িত্ব নেন রবার্তো মার্তিনেজ। তরুণ প্রতিভায় ভরা দলটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু প্রথম বড় সিদ্ধান্তেই তিনি ভিন্ন পথ বেছে নেন। সৌদি আরবে গিয়ে রোনালদোর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে কেন্দ্র করেই ইউরো ২০২৪-এর পরিকল্পনা সাজান। বাছাইপর্বে গোলের বন্যা বইয়ে দিলেও জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ইউরোতে রোনালদো ছিলেন ছায়ামানব। প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি শট নেওয়া খেলোয়াড় হয়েও একটিও গোল করতে পারেননি। তার গোলের খোঁজে মরিয়া প্রচেষ্টা অনেক সময় দলের জন্যই হয়ে ওঠে সমস্যার কারণ।

জর্জিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২-০ গোলে হারের পর চাপ আরও বেড়ে যায়। এরপর স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি মিস করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি রোনালদো। ফ্রাঙ্কফুর্টের সেই দৃশ্য ছিল ভক্তদের জন্য অপ্রত্যাশিত, হয়তো রোনালদোর জন্যও। সেদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। কাতারে কান্না এসেছিল বিদায়ের পর, কিন্তু এবার ম্যাচ চলাকালীনই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

যে মানুষটি বছরের পর বছর নিজের কাঁধে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন, হঠাৎ করেই যেন দেখলেন মুদ্রার উল্টো পিঠ। এবার সতীর্থরাই তাকে বহন করছে। একজন চিরযোদ্ধার জন্য এর চেয়ে কঠিন বাস্তবতা আর কী হতে পারে! তবু সেখানেও রোনালদোর সাহস অটুট ছিল। টাইব্রেকারে প্রথম শট নিতে এগিয়ে গিয়ে গোলও করেন তিনি। সমালোচনার মাঝেও সেটি ছিল তার মানসিক দৃঢ়তার আরেকটি প্রমাণ।

ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও মার্তিনেজ রোনালদোকেই ভরসা করেন। কিন্তু ফল বদলায়নি। গোলশূন্য থেকে বিদায় নেয় পর্তুগাল। এরপর দেশজুড়ে শুরু হয় বিতর্ক। অনেক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে রোনালদো ছিলেন বিতর্কিত এক নাম। আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, পর্তুগালের চেয়েও রোনালদো বড়! প্রশ্ন উঠতে থাকে, দল কি এখনও রোনালদোকে ঘিরে খেলবে, নাকি নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে? তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। নেশনস লিগে ভালো ফল করেছে পর্তুগাল। কিন্তু রোনালদোকে ঘিরে প্রশ্ন থামেনি।

তাইতো ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি রোনালদোর উত্তরাধিকার নির্ধারণের মঞ্চ। ক্লাব ফুটবলে তিনি জিতেছেন প্রায় সবকিছু। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরো শিরোপা, নেশনস লিগ, অগণিত গোল ও রেকর্ড। কিন্তু বিশ্বকাপ এখনও তার ট্রফি ক্যাবিনেটের শূন্যতম স্থান। অনেকে তাকে সর্বকালের সেরাদের একজন বলেন। কেউ কেউ সর্বকালের সেরাই মনে করেন। কিন্তু বিশ্বকাপের গল্পে তার নাম এখনও অসম্পূর্ণ।

২০২৬ সালে হয়তো তিনি আগের মতো ক্ষিপ্র হবেন না। হয়তো আগের মতো ৯০ মিনিট মাঠ কাঁপাবেনও না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কিছু কিছু খেলোয়াড়কে কেবল বয়স দিয়ে মাপা যায় না। রোনালদো সেই বিরলদের একজন। চার বছর আগে কাতারে যে স্বপ্নকে মৃত মনে হয়েছিল, সেটি আবার নতুন করে জেগেছে। আর তাই এবারের বিশ্বকাপ শুধু পর্তুগালের জন্য নয়, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্যও এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে তিনি কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ স্পর্শ করতে পারবেন?

উত্তরটি এখনও ভবিষ্যতের হাতে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি চোখ অপেক্ষা করবে রোনালদোর শেষ নৃত্য দেখার।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   অপূর্ণ  স্বপ্ন  শেষ  অভিযান  রোনালদো 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: