চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি যেন থমকে গিয়েছিল মিকেল মেরিনোর সময়। ডান পায়ের স্ট্রেস ফ্র্যাকচারে আক্রান্ত হয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে যান তিনি। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নও তখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তবে কয়েক মাসের কঠিন লড়াই শেষে এখন স্পেনের জার্সিতে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নামার অপেক্ষায় এই মিডফিল্ডার।
অস্ত্রোপচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেরিনো লিখেছিলেন, ‘অপারেশন শেষ। মাঠে ফেরার পথে আমি এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।’ সেখান থেকেই শুরু হয় তার বিশ্বকাপে ফেরার লড়াই। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে সফল হন স্প্যানিশ তারকা। আর্সেনালের হয়ে মাঠে ফিরে জায়গা করে নেন স্পেনের বিশ্বকাপ দলেও। ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের আবেগ, চোটের সময়ের সংগ্রাম এবং স্পেনের সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
বিশ্বকাপের কথা উঠতেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান মেরিনো। তার ভাষায়, ‘বিশ্বকাপের কথা শুনলে আমার চোখে ভেসে ওঠে এক শিশুর ছবি। যে স্বপ্ন দেখে, চোখে তারকার ঝিলিক নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে কিংবদন্তিদের খেলা দেখছে। আমি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছি, প্রিমিয়ার লিগ জিতেছি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও খেলেছি। কিন্তু দেশের হয়ে বিশ্বকাপে খেলার চেয়ে বড় কিছু নেই।’
এবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন ৩০ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপ অভিষেক নিয়ে তিনি বলেন, ‘একদিকে বিশ্বকাপে অভিষেকের উত্তেজনা আছে, অন্যদিকে বয়স ও অভিজ্ঞতা আমাকে শান্ত থাকতে সাহায্য করছে। এখন আমি জানি, এটাও শেষ পর্যন্ত একটি ফুটবল ম্যাচ। মুহূর্তটা উপভোগ করতে হলে নিজেকে শান্ত রাখতে হবে।’
চোট পাওয়ার পর বিশ্বকাপ মিস করার ভয়ও তাড়া করেছিল তাকে। মেরিনো বলেন, ‘যখন শুনলাম সুস্থ হতে পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগতে পারে, তখন মনে হয়েছিল হয়তো বিশ্বকাপ মিস করব। এই দলের সঙ্গে আমার যে পথচলা, যে সাফল্য, সেখান থেকে দূরে থাকা খুব কঠিন হতো। তবে কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং এখন মনে হচ্ছে শৈশবের স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ দীর্ঘ পুনর্বাসনের সময়টাকে জীবনের বড় শিক্ষা হিসেবেও দেখছেন তিনি।
‘জীবনে এমন অনেক কিছু আছে, যার মূল্য আমরা তখনই বুঝি যখন সেগুলো হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়। আবার অনুশীলনে ফেরা, সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামা কিংবা শুধু ঘাসের গন্ধ পাওয়াটাও তখন বিশেষ অনুভূতি হয়ে উঠেছিল। এখন মাঠে নামতে পারলেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়,’ বলেন মেরিনো।
ইউরো ২০২৪ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপেও অন্যতম ফেবারিট হিসেবে দেখা হচ্ছে স্পেনকে। তবে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ মেরিনো। তিনি বলেন, ‘এখন সবাই আমাদের ফেবারিট বলছে, কারণ আমরা সেটা অর্জন করেছি। কিন্তু ফুটবলে কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। যেকোনো দলই আপনাকে হারিয়ে দিতে পারে। তবে আমরা যদি নিজেদের সেরাটা খেলতে পারি, তা হলে যে কাউকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে।’
বর্তমান স্পেন দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ড্রেসিংরুমের পারিবারিক পরিবেশকে দেখছেন তিনি। ‘আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, বরং আমরা একটি পরিবারের মতো। সবাই একে অপরের পাশে দাঁড়াই, একসঙ্গে সময় কাটাই এবং কঠিন সময়ে একে অপরকে সমর্থন করি,’ বলেন মেরিনো। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের ভূয়সী প্রশংসাও করেন এই মিডফিল্ডার। তার মতে, ‘তিনি সবসময় ভালো মানুষ বেছে নেন এবং দলের স্বার্থকে সবার আগে রাখেন।
এ কারণেই আমাদের মধ্যে দারুণ ঐক্য তৈরি হয়েছে।’ চোটের অন্ধকার সময় পেছনে ফেলে এখন বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়ে মিকেল মেরিনো। তার কাছে এটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং বহুদিন ধরে লালন করা শৈশবের স্বপ্ন পূরণের মঞ্চ।
সময়ের আলো/আআ