মেক্সিকান বাজপাখি গুইলার্মো ওচোয়া

ক্রীড়া প্রতিবেদক

খেলা

ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু চরিত্র থাকে, যারা ক্লাব ফুটবলের ট্রফি বা চাকচিক্যের চেয়ে দেশের জার্সিতে বেশি উজ্জল ও ভাস্বর। যারা

2026-06-11T03:21:02+00:00
2026-06-11T03:21:02+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
খেলা
মেক্সিকান বাজপাখি গুইলার্মো ওচোয়া
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৩:২১ এএম   (ভিজিট : ৭)
গুইলার্মো ওচোয়া। ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বে এমন কিছু চরিত্র থাকে, যারা ক্লাব ফুটবলের ট্রফি বা চাকচিক্যের চেয়ে দেশের জার্সিতে বেশি উজ্জল ও ভাস্বর। যারা চার বছর পরপর কোনো অতিমানবীয় রূপ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হন, বিশ্বকাপ এলেই যেন তাদের আসল রূপটি চেনা যায়। মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক ফ্রান্সিসকো গুইলার্মো ওচোয়া মাগানা তাদের একজন। ফুটবল দুনিয়া যাকে চেনে ‘মেমো ওচোয়া’ নামে। কোঁকড়া চুল, মাথায় চিরচেনা রঙিন ব্যান্ড আর গোলপোস্টের নিচে বাজপাখির মতো ডানা মেলে ওড়ার অদম্য ক্ষমতা তাকে ফুটবল ইতিহাসের আইকনিক গোলরক্ষকে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ফিফা বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স এবং শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য সব ‘অ্যাক্রোবেটিক’ সেভ কোনো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। 

ওচোয়ার ফুটবল ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ২০০৪ সালে, মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম সফল ক্লাব ‘ক্লাব আমেরিকা’র হয়ে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ওলন্দাজ কোচ লিও বেনহাকারের জহুরি চোখে ধরা পড়েন তিনি এবং মূল দলে তার অভিষেক ঘটে। মাঠে নেমেই নিজের অসাধারণ রিফ্লেক্স, ক্ষিপ্রতা এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার অদ্ভুত ক্ষমতার প্রমাণ দেন এই তরুণ। দ্রুতই তিনি দলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ক্রিশ্চিয়ান মার্টিনেজকে সরিয়ে প্রথম পছন্দের হিসেবে দলে নিজের জায়গা পাকা করেন।

২০০৫ সালে ক্লাব আমেরিকাকে ক্লাউসুরা চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ওচোয়া, যা ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম বড় কোনো শিরোপা। সেই বছরের শেষের দিকে তিনি ক্লাবের হয়ে ‘ক্যাম্পিওন ডি ক্যাম্পিওনেস’ ট্রফিও জেতেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত এই ক্লাবে কাটানো প্রথম দফায় তিনি প্রায় আড়াই শতাধিক ম্যাচ খেলেন। এই দীর্ঘ সময়ে মেক্সিকোর ঘরোয়া ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষকই হননি, বরং লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা উদীয়মান তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ক্লাব আমেরিকার হয়ে তার এই ধারাবাহিক ও চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের স্কাউটদের নজর কাড়তে বাধ্য করেছিল।

২০১১ সালে ওচোয়া প্রথম মেক্সিকান গোলরক্ষক হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলতে ফরাসি ক্লাব আজাসিওতে যোগ দেন। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর তিনি স্প্যানিশ লা লিগার ক্লাব মালাগায় যোগ দেন। তবে সেখানে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক কার্লোস কামেনির কারণে বেশিরভাগ সময় সাইডবেঞ্চে কাটাতে হয়, যা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন সময়। পরবর্তীতে তিনি ধারে আরেক স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাদায় খেলেন। ২০১৬-১৭ মৌসুমে গ্রানাদার দুর্বল রক্ষণভাগের কারণে দল রেলিগেটেড হলেও, ওচোয়া একাই পুরো মৌসুমে ১৬২টি সেভ করে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড গড়েন।

এরপর তিনি বেলজিয়ামের স্ট্যান্ডার্ড লিজের হয়ে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দারুণ সময় কাটান এবং ক্লাবকে বেলজিয়াম কাপ জেতাতে সাহায্য করার পাশাপাশি উয়েফা ইউরোপা লিগেও খেলেন। ২০১৯ সালে ঘরের ছেলে আবার তার প্রিয় ক্লাব আমেরিকায় ফিরে আসেন এবং মেক্সিকান লিগে নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন। এখানেই শেষ নয়, ২০২৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে তিনি আবারও ইউরোপে পাড়ি জমান এবং ইতালিয়ান সিরি-এর ক্লাব সালের্নিতানাতে যোগ দিয়ে এসি মিলান ও ইন্টার মিলানের মতো জায়ান্টদের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য সব ম্যাচ উপহার দেন।

ওচোয়ার ক্যারিয়ারকে যদি একটি সুতোয় বাঁধতে হয়, তবে তার নাম হবে ‘ফিফা বিশ্বকাপ’। ২০০৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে ওচোয়ার অভিষেক ঘটে। এরপর তিনি ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ এবং ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দলের স্কোয়াডে ডাক পেলেও তৎকালীন কোচদের সিদ্ধান্তে মূল একাদশে খেলার সুযোগ পাননি। কিন্তু ওচোয়া দমে যাননি, তিনি অপেক্ষা করেছিলেন নিজের সময়ের জন্য।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ওচোয়াকে বিশ্বমঞ্চের আলোয় নিয়ে আসে। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক লড়াই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে গণ্য করা হয়। নেইমার, অস্কার এবং থিয়াগো সিলভাদের একের পর এক বুলেট গতির শট ও হেড যেভাবে ওচোয়া গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন, তা দেখে পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হয় এবং ওচোয়া রাতারাতি বৈশ্বিক সুপারস্টারে পরিণত হন। নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও ছিলেন অনবদ্য।

এরপর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও তার ফর্ম ছিল দেখার মতো। ২০১৪ চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে মেক্সিকোর ১-০ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়ে ওচোয়া পোস্টের নিচে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, টনি ক্রুসের ফ্রি-কিক যেভাবে তিনি বারে লাগিয়ে প্রতিহত করেছিলেন তা ছিল দেখার মতো। পুরো টুর্নামেন্টে ২৫টি দুর্দান্ত সেভ করে আসরের দ্বিতীয় সেরা গোলরক্ষক হন। 

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এসেও ওচোয়ার জাদু কমেনি; পোল্যান্ডের বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার রবার্ট লেভানডফস্কির পেনাল্টি আটকে দিয়ে আবারও প্রমাণ করেন যে, বিশ্বমঞ্চে তিনি কতটা ভয়ংকর। মেক্সিকোর জার্সিতে ১৫৫টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ওচোয়া ইতিহাসের মাত্র অল্প কয়েকজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের একজন, যারা পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার বিরল গৌরব অর্জন করেছেন।

জাতীয় দলের হয়ে কেবল বিশ্বকাপেই নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট ‘কনকাকাফ গোল্ড কাপ’-এ ওচোয়ার রেকর্ড অনন্য। তিনি মেক্সিকোর হয়ে রেকর্ড ৫ বার (২০০৯, ২০১১, ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৩) এই মহাদেশীয় ট্রফি জয় করেছেন। গুইলার্মো ওচোয়া কেবল একজন ফুটবলার বা গোলরক্ষক নন, তিনি মেক্সিকান ফুটবলের আবেগ, সংস্কৃতির অংশ এবং বিশ্বস্ততার এক জীবন্ত প্রতীক। ক্লাব ফুটবলে তার ক্যারিয়ার হয়তো লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিতে ঠাসা নয়, কিন্তু যখনই গায়ে মেক্সিকোর সেই সবুজ জার্সি জড়াতো, ওচোয়া যেন কোনো এক জাদুবলে হয়ে উঠতেন অপরাজেয়, অভেদ্য এক দেয়াল।

ফুটবল মহাবিশ্বে অনেকেই আসেন, অনেকে চলে যান, কিন্তু চার বছর পর পর বিশ্বকাপের ঘণ্টা বাজলেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে যে মানুষটির কোঁকড়া চুল আর রিফ্লেক্সের স্মৃতি ভেসে ওঠে, তিনি গুইলার্মো ওচোয়া। তিনি ফুটবল ইতিহাসের এমন এক অনন্য ও চিরসবুজ রূপকথা, যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্বকাপের সবুজ মাঠ আর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্ভীক, অপরাজেয় মেক্সিকান বীরের অবয়ব।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   মেক্সিকো  ফুটবল  গুইলার্মো ওচোয়া 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: