ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের গল্পে ভরপুর। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি কিংবা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোই বারবার বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে ফুটবলের ভূগোল। আধুনিক অবকাঠামো, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি বড় উদাহরণ, যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর উপস্থিতি ও সম্ভাবনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
একসময় বিশ্বকাপে মুসলিম দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ছিল খুবই সীমিত। কয়েকটি দল কেবল অংশ নিত কিন্তু প্রতিযোগিতায় খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারত না। তবে ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপের ফলে এবার মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরে।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা ঘিরে আছে মরক্কোকে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তারা ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছায়। স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় করে তারা দেখিয়ে দেয়, বিশ্বফুটবলের প্রচলিত শক্তির বাইরে থেকেও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব। মরক্কোর সেই অর্জন শুধু একটি দেশের গৌরব নয় বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলটি ঘিরে রয়েছে বড় প্রত্যাশা।
এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল ইরানও ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। গত কয়েকটি বিশ্বকাপেই তারা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছে এবং শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। একইভাবে সৌদি আরবও নিজেদের ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ফুটবল অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ, ইউরোপের শীর্ষ তারকাদের দেশীয় লিগে নিয়ে আসা এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের উন্নয়নের পরিকল্পনা দেশটির ফুটবলকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে হারিয়ে সৌদি আরব বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। সেই জয় এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হয়।
কাতারও মুসলিম বিশ্বের ফুটবল উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে দেশটি শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। যদিও স্বাগতিক হিসেবে তাদের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, তবুও ফুটবল উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাতারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ইতিমধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত গল্প জর্ডান ও উজবেকিস্তান। জর্ডান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়েছে। কয়েক বছর আগেও যাদের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ মনে করা হতো, তারাই এখন বিশ্বের সেরা আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একইভাবে উজবেকিস্তানও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে মধ্য এশিয়ার ফুটবলের অগ্রগতির বার্তা দিয়েছে।
মিসর দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত। মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে দেশটি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। একইভাবে সেনেগালও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি। ২০২২ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে ওঠা দলটি এবারও নিজেদের প্রমাণ দিতে প্রস্তুত। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং ইউরোপের শীর্ষ লীগে খেলা একাধিক ফুটবলারের উপস্থিতি সেনেগালকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলেছে।
দুবারের আফ্রিকান কাপ ও ২০২১ আরব কাপ চ্যাম্পিয়ন আলজেরিয়া ফুটবলের অন্যতম লড়াকু দল। ১৯৮২ বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারানো এবং ২০১৪ সালে নকআউট পর্বে ওঠাই বিশ্বমঞ্চে ‘ডেজার্ট ফক্স’দের সেরা সাফল্য। গেল দুই আসরে বাছাইপর্ব পেরুতে না পারা আলজেরিয়ানরা এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবে। মূল লড়াইয়ে নামার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে দিয়েছে দলটি। এবার গ্রুপ ‘জে’তে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, জর্ডান আর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে লড়বে আলজেরিয়া।
অন্যদিকে ঘানা ও আইভরি কোস্টও আফ্রিকান ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ঘানা একাধিকবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠে নিজেদের সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তারা। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ফুটবলারদের নিয়ে আবারও বড় মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরতে চায় দেশটি। একইভাবে সদ্য আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স জেতা আইভরি কোস্টও আত্মবিশ্বাসী। শক্তিশালী স্কোয়াড, ইউরোপভিত্তিক খেলোয়াড় এবং সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্য দলটিকে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে।
মুসলিম বিশ্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল শক্তি তুরস্ক। ২০০২ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনের মাধ্যমে দেশটি নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেয়। শক্তিশালী ঘরোয়া লিগ ও ইউরোপে খেলা একাধিক ফুটবলার। ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘ডি’তে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়বে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে খেলছে। ইউরোপিয়ান প্লে-অফে ইতালিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকেট নিশ্চিত করেছে দলটি। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে এবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করার লক্ষ্য তাদের। গ্রুপ ‘বি’তে স্বাগতিক কানাডা, কাতার ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লড়বে তারা।
মুসলিম বিশ্বের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ফুটবল অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, বয়সভিত্তিক দল গঠনের প্রতি গুরুত্ব, ইউরোপীয় লিগে খেলোয়াড়দের নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং প্রবাসী ফুটবলারদের অবদান এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অনেক দেশ এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার ফল আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
যদিও বিশ্বকাপ জয়ের দৌড়ে এখনও ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোই এগিয়ে, তবুও মুসলিম দেশগুলো আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়। তারা এখন নকআউট পর্বে উঠছে, বড় দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং বিশ্বফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই মুসলিম বিশ্বের জন্য শুধু অংশগ্রহণের আসর নয়, নিজেদের সামর্থ্য ও অগ্রগতির প্রমাণ দেওয়ারও বড় মঞ্চ। বিশ্বফুটবলের নতুন বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বের দলগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং ভবিষ্যতে সেই প্রভাব আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সময়ের আলো/আআ