দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখা নৈতিক দায়িত্ব

মুহাম্মাদ যুবায়ের হাসান

ইসলাম

বর্তমান সময়ে অর্থনীতির একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখনই কোনো পণ্যের চাহিদা তৈরি

2026-06-11T05:41:55+00:00
2026-06-11T05:41:55+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
ইসলাম
দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখা নৈতিক দায়িত্ব
মুহাম্মাদ যুবায়ের হাসান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৫:৪১ এএম   (ভিজিট : ৭)
ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান সময়ে অর্থনীতির একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখনই কোনো পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, তখন একটি অসাধু চক্র মজুদদারি বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি- সব ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। 

ইসলাম ব্যবসায়িক মুনাফাকে বৈধতা দিলেও মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মুনাফাখোরি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
ব্যবসায় ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ইসলাম ব্যবসাকে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার কারণে তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য পরকালে বড় মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এই বৈধতার সীমানা হলো সততা ও মানবিকতা। ধোঁকাবাজি, ভেজাল, জালিয়াতি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জন করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও অভিশপ্ত কাজ।

মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট একটি ঘৃণিত অপরাধ
ইসলামি শরিয়তে মজুদদারি বা ‘ইহতিকার’ একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য। ইহতিকার অর্থ হলো- মানুষের খাদ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বেশি লাভের আশায় গুদামজাত করে রাখা, যাতে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) মজুদদারদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খাদ্যশস্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৩৮)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি (সংকট তৈরি করে) খাদ্যশস্য গুদামজাত করে, সে অপরাধী’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬০৫)। 

যেসব পরিস্থিতিতে পণ্য মজুদ করা ইসলামে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ, আলেমগণ সেগুলোকে চিহ্নিত করেছেন- ১. বাজারে পণ্যের দাম কম থাকার সুযোগে অধিক লাভের আশায় এমনভাবে পণ্য গুদামজাত করা, যার ফলে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ২. প্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান কমিয়ে ক্রেতাকে চরম সংকটের সম্মুখীন করা। ৩. খাদ্যদ্রব্যের সংকটকালে যেকোনো পরিমাণে পণ্য মজুদ রাখা। ৪. বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পণ্যের সরবরাহ বন্ধ রাখা।
সিন্ডিকেট ও সামাজিক অবিচার

সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি করে অর্থ উপার্জন করে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি চরম মানবিক অবিচার। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয় কোনো অপরাধ ছাড়াই, তারা নিশ্চিতভাবেই মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা নিজেরা বহন করে’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৮)। গরিব-দুঃখী ও খেটে খাওয়া মানুষ যখন বাজারের উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট হয়, তখন তাদের দীর্ঘশ্বাস ও ফরিয়াদ আল্লাহর দরবারে পৌঁছায়। 

এই ব্যবসায়ীদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক সময় সমাজে দুর্ভিক্ষ ও বিপর্যয় নেমে আসে। রাসুল (সা.) আরও স্পষ্ট করেছেন যে, ‘মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখে, সে ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মাদারি থেকে মুক্ত এবং আল্লাহ তার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট হন।’ (মিশকাত : ১৩১৬)

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের ভূমিকা
ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকার বা বাজার কর্তৃপক্ষকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সাহাবিদের যুগেও বাজারে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তদারকির ব্যবস্থা ছিল। রাসুল (সা.)-এর সময় মদিনার বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য ‘মুহতাসিব’ বা বাজার পরিদর্শক নিয়োগ করা হতো। যখন কোনো অসাধু ব্যবসায়ী জনগণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ায়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কঠোর হাতে তা দমন করা এবং প্রয়োজনবোধে পণ্যের দাম নির্ধারণ (তাসির) করে দেওয়া, যাতে সাধারণ নাগরিকরা উপকৃত হয়।

ব্যবসায়ীদের প্রতি নসিহত ও পরকালীন সতর্কতা
ব্যবসায়ীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের মাধ্যমেই পণ্য ও সেবা মানুষের হাতে পৌঁছায়। তাদের সততা ও মানবিকতা পুরো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ইসলাম ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করে যে, তারা যেন মুনাফার পাশাপাশি বরকতের দিকে নজর দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবেন’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)। 

সুতরাং একজন মুমিন ব্যবসায়ীর মূল লক্ষ্য হবে মানুষের সেবা এবং হালাল উপার্জন। পার্থিব সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এই অবৈধ উপার্জনের জন্য পরকালে যে কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে, তা একজন বিবেকবান মুমিনকে অবশ্যই ভাবিয়ে তুলবে। যারা সাময়িক লাভের আশায় মজুদদারি করে, তারা আসলে নিজেদের আখেরাত নষ্ট করছে।

মোটকথা, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ইসলামি নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের ব্যবসায়ীদের উচিত ইসলামের হালাল ও হারাম সম্পর্কিত বিধানগুলো সঠিকভাবে মেনে চলা। সিন্ডিকেট বা মজুদদারি করে যে সম্পদ অর্জন করা হয়, তা সুখের পরিবর্তে অভিশাপ নিয়ে আসে। রাষ্ট্র ও জনগণকেও সম্মিলিতভাবে এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তওফিক দান করুন এবং দেশের অর্থনীতিকে সব ধরনের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট মুক্ত রাখুন।



  বিষয়:   দ্রব্যমূল্য  ঠিক  রাখা  নৈতিক  দায়িত্ব 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: