মিরপুরের আকাশে তখনও কালো মেঘ। কিন্তু শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি, ড্রেসিংরুম আর দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে তখন উৎসবের রংধনু। একসময় যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি জয়ই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই এবার সিরিজে হারিয়ে দিল টাইগাররা। শুধু হারানো নয়, তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত করল ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় গোটা পৃথিবী যখন ফুটবল মহাযজ্ঞ ঘিরে ব্যস্ত, তখন মিরপুরে বাংলাদেশের ক্রিকেট লিখল নিজেদের এক নতুন মহাকাব্য। বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৫ উইকেটের জয় এনে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও তার সতীর্থরা।
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে কার্ডিফের সেই ২০০৫ সালের জয়ই ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্মৃতি। সময় বদলেছে, বদলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও। এখন আর অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তব। মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, দেশের মাটিতে তারা এখন বিশ্বের যেকোনো দলের জন্য ভংকঙ্কর প্রতিপক্ষ।
জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৪১ ওভারে ১৯২ রান। বৃষ্টিতে ভেজা বিকালে যখন স্কোরবোর্ডে প্রয়োজন ৩৭ বলে মাত্র ৩ রান, তখন ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন কোচ ফিল সিমন্স, সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ব্যাটিং কোচ সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলসহ দলের সদস্যরা। সেই মুহূর্তে অধিনায়ক মিরাজ এগিয়ে এসে ছক্কা হাঁকিয়ে শেষ করেন ম্যাচ। আর সেই ছক্কার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট।
মঙ্গলবার প্রথম ম্যাচে ৮৬ রানের বড় জয় দিয়ে সিরিজ শুরু হয়েছিল। সেই জয় পূর্ণতা পেল সিরিজ নিশ্চিত করার মাধ্যমে। এখন টাইগারদের সামনে সুযোগ আরও বড় ইতিহাস গড়ার। শেষ ম্যাচে জিততে পারলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করবে বাংলাদেশ।
এই সিরিজ জয় ঘরের মাঠে বাংলাদেশের টানা চতুর্থ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ জয়ও। এর আগে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছিল টাইগাররা। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াও।
ম্যাচের শুরুতেই বাংলাদেশ দেখিয়েছে নিজেদের আগ্রাসী মানসিকতা। প্রথম ওয়ানডেতে ইনিংসের প্রথম বলে উইকেট নেওয়া তাসকিন আহমেদ দ্বিতীয় ম্যাচেও প্রথম ওভারেই আঘাত হানেন। এরপর মোস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয় ওভারের প্রথম ও শেষ বলে উইকেট তুলে নিলে মাত্র ১২ বলের মধ্যে কোনো রান না করেই ৩ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডে ক্রিকেটের ১০২৪ ম্যাচের ইতিহাসে এই প্রথম ইনিংসের শুরুতে শূন্য রানে ৩ উইকেট হারানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো অস্ট্রেলিয়ার। বাংলাদেশের বোলারদের আগুনঝরা শুরুতে সফরকারীরা মুহূর্তেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
একটা সময় ৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে সপ্তম উইকেটে মার্নাস লাবুশেন ও জ্যাভিয়ার বার্টলেট গড়ে তোলেন ১০৩ রানের লড়াকু জুটি। দুজনই তুলে নেন হাফসেঞ্চুরি। বার্টলেট ৪৮ বলে ৫২ রান করেন আর লাবুশেন খেলেন দায়িত্বশীল ইনিংস। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলারদের সামনে খুব বেশি দূর যেতে পারেনি সফরকারীরা।
তাসকিন আহমেদ ৪১তম ওভারে বার্টলেটকে বোল্ড করে জুটি ভাঙেন। পরের বলেই অ্যাডাম জাম্পাকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও জাগান তিনি। যদিও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এরপর বৃষ্টির কারণে খেলা থেমে গেলে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রানেই থামে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। পরে ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
জবাব দিতে নেমে শুরুটা সুখকর ছিল না বাংলাদেশের। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই তানজিদ হাসান তামিম আউট হয়ে ফিরেন। তবে এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকারের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় উইকেটে দুজন যোগ করেন ৮৬ রান। সৌম্য ৪২ রান করে বিদায় নিলেও নিজের দায়িত্ব ঠিকই পালন করেছেন। অন্যদিকে ৪২ রান করে আউট হওয়ার পথে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন শান্ত।
এরপর দায়িত্ব তুলে নেন তাওহীদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। দুজনই ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ম্যাচকে নিয়ে যান বাংলাদেশের নাগালে। হৃদয় অপরাজিত থাকেন ৪০ রানে আর মিরাজ ২২ রানে অপরাজিত থেকে ছক্কা হাঁকিয়ে শেষ করেন ম্যাচ।
এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু জয় নয় বরং বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তির বিপক্ষে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কয়েক বছর আগেও যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় ছিল বিস্ময়ের ঘটনা, এখন সেই দলকেই সিরিজে হারিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবারের এই সন্ধ্যা শুধু একটি জয় নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরিণত হয়ে ওঠার প্রতীক। এটি আত্মবিশ্বাসের জয়, পরিকল্পনার জয়, দলগত শক্তির জয়। এখন বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ইতিহাসকে আরও উজ্জ্বল করার। শেষ ম্যাচে জিততে পারলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পূর্ণাঙ্গ হোয়াইটওয়াশের কীর্তিও গড়তে পারবে স্বাগতিকরা। তবে তার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে সবচেয়ে বড় অর্জনটি। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিকে হারিয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেওয়ার এই সাফল্য দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।